দেশে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এ চিত্র।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য জানান সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য বিগত সরকারের ভুলনীতি, রেল ও নৌপথ সংকুচিত করা এবং সড়কনির্ভর যাতায়াতব্যবস্থাকে দায়ী করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ, আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এ দুই মাধ্যমে তখন ৮০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করতেন। সড়কপথ ব্যবহার করতেন ২০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পর রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ফলে যাতায়াতব্যবস্থা সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ওপরও।
সড়ক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, বেপরোয়া গতি এবং মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। চালকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা এবং অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়ার বিষয়টিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সমিতির মহাসচিব।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও চলাচল, সড়কে বিভাজক না থাকা, বাঁকে গাছপালার কারণে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মহাসড়কের নির্মাণত্রুটিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি। ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যানবাহন চালানো, পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম এবং চালকদের বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানোর ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে বলেও জানানো হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থার অভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও লেগুনার মতো যানবাহনের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। এতে সড়কে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনাও বাড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
পাশাপাশি চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ, নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা, সড়কে নির্দেশক চিহ্ন ও রেখা স্থাপন, যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল বন্ধ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ একাডেমি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।