রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ঈশ্বরদী ইপিজেডের মালামাল পরিবহনের জন্য প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ। উদ্বোধনের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এই রেলপথে এখনো কোনো বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। দু-একবার খালি মালবাহী ওয়াগনের শান্টিং এবং রেল কর্মকর্তাদের মোটরট্রলি চলাচল ছাড়া নিয়মিত কোনো কার্যক্রম নেই। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন অংশ এখন কাশবন, ঘাস, লতাপাতা ও জঙ্গলে ঢেকে গেছে।
২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি ঈশ্বরদী-রূপপুর রেলপথ ও রূপপুর রেলস্টেশনের উদ্বোধন করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দেশি-বিদেশি অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলে। ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী জংশন হয়ে রূপপুর পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি ‘রূপপুর’ নামে একটি আধুনিক রেলস্টেশনও নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৩টি লেভেল ক্রসিং, সাতটি বক্স কালভার্ট এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগের জন্য কম্পিউটারভিত্তিক কালার লাইট সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় মালামাল রেলপথে পরিবহন করা হবে। পাশাপাশি ঈশ্বরদী ইপিজেডের পণ্য পরিবহনেও এটি ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পর এত সময় পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
সম্প্রতি রূপপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাকশীর পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা আধুনিক স্টেশনটি প্রায় জনশূন্য। সেখানে শুধু রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্ল্যাটফর্মে জমেছে ময়লা। টিকিট কাউন্টার, মালামাল বুকিং কক্ষ, অতিথিশালা, ভিআইপি কক্ষ, প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার, স্টেশন মাস্টার ও সহকারী স্টেশন মাস্টারের কক্ষসহ অধিকাংশ কক্ষই তালাবদ্ধ।
স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য জানান, স্টেশন থেকে বের হওয়ার রাস্তা হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচ দিয়ে গেছে। ওই পথে ভারী মালামাল পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মালামাল লোড-আনলোডের কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে তিনি শুনেছেন।
পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন এই রেলপথে মোটরট্রলি চালানো হয়। রূপপুর স্টেশনের ইয়ার্ডে রেলের নতুন কিছু ওয়াগন ও কোচও রাখা হয়েছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা এসব কোচ ও ওয়াগন স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তার কারণে সেখানে রাখা হয়েছে। তবে রূপপুর প্রকল্পের জন্য এখনো এই রেলপথ দিয়ে নিয়মিত কোনো মালামাল পরিবহন হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি এভাবে পড়ে থাকা হতাশাজনক। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় রেললাইন ও আশপাশের এলাকায় আগাছা-লতাপাতা বেড়ে গিয়ে অনেকটা ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দ্রুত রেলপথটি কার্যকরভাবে ব্যবহার শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোশারেফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এখনো এই রেলপথে বাণিজ্যিকভাবে কোনো ট্রেন চলাচল করেনি।
পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা আলম বলেন, রূপপুর প্রকল্পের জন্যই রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষই এটি ব্যবহার করবে। বর্তমানে হয়তো ব্যবহার হচ্ছে না, তবে ভবিষ্যতে রূপপুর প্রকল্পের কাজে এই রেলপথের ব্যবহার অনেক বাড়তে পারে।