জামালপুরের চরাঞ্চলে গভীর রাতে অসুস্থ ঘোড়া জবাই করে সেই মাংস ঢাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস হিসেবে বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯৫০ কেজি ঘোড়ার মাংস জব্দ এবং কসাই চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটকের পর এই প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
পুলিশের তদন্ত ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরাঞ্চল ও নির্জন এলাকাকে কেন্দ্র করে তিনটি পৃথক দলের মাধ্যমে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হতো। প্রথম দলের সদস্যরা জামালপুরের তুলশীপুর হাট থেকে কম দামে অসুস্থ ও অকেজো ঘোড়া সংগ্রহ করতেন। পরে সেগুলো প্রশাসনের নজর এড়িয়ে তুলশিরচর ইউনিয়নের নির্জন মানিকার চরে নেওয়া হতো।
চরে ১৫ থেকে ২০টি ঘোড়া জমা হওয়ার পর দ্বিতীয় দলের সদস্যরা গভীর রাতে সেগুলো জবাই করে চামড়া ছাড়ানো ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতেন। পরে রাতের শেষভাগে পিকআপ ভ্যানে করে মাংস ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন প্রবেশমুখে তৃতীয় দলের সদস্যরা মাংস বুঝে নিয়ে তা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জামালপুর সদর উপজেলার নরুন্দি বাজার এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল একটি পিকআপ। তল্লাশি চালিয়ে গাড়িটি থেকে ১৮ বস্তায় প্রায় ৯৫০ কেজি অস্বাস্থ্যকর মাংস উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ১৩টি জবাই করা ঘোড়ার সন্ধান পাওয়া যায় এবং কসাই চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে উদ্ধার করা মাংস মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করা হয়।
নরুন্দি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ নাজমুল হক জানান, তুলশীপুরের হাট থেকে অসুস্থ ঘোড়া সংগ্রহ করে মানিকার চরে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০টি ঘোড়া জবাই করে মাংস ঢাকায় পাঠানো হতো। পরে রাজধানীর বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেলে কালাভুনা বা কাবাবের মতো পদে গরুর মাংসের নামে এসব মাংস বিক্রি করা হতো।
পুলিশের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে কেজিপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকায় মাংস কিনে ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হতো। জামালপুর থেকে ঘোড়া সংগ্রহ ও জবাইয়ের সঙ্গে দুদু নামের এক ব্যক্তি এবং ঢাকায় সরবরাহের সঙ্গে এমদাদ নামের আরেক ব্যক্তি জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য স্বীকার করেছেন বলেও দাবি পুলিশের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চরাঞ্চলের নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। রাতে ঘোড়া ও ট্রলারের শব্দ শোনা গেলেও বিষয়টির গভীরতা তারা বুঝতে পারেননি। স্থানীয়দের কয়েকজন দাবি করেছেন, ঘটনার পর কসাই দলের কয়েকজনকে আটকের পর অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেহেদী হাসান। তার দাবি, তিনি পুলিশকে আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেছেন এবং আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অভিযুক্ত ঘোড়া ব্যবসায়ী দুদু মিয়ার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেননি। তবে তার ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেম ঘোড়া ব্যবসার সঙ্গে দুদু মিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
জামালপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পশু জবাইয়ের অনুমতি থাকলেও বাণিজ্যিকভাবে ঘোড়া জবাই করে মাংস বাজারজাত করার অনুমতি নেই। ফলে এভাবে ঘোড়া জবাই ও মাংস বিক্রি করা বেআইনি।
পুলিশ জানিয়েছে, এটি আন্তজেলা চক্রের একটি অংশ হতে পারে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসুস্থ ঘোড়া সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।