Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / জাতীয় / পুলিশের জন্য কেনা হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি - Chief TV

পুলিশের জন্য কেনা হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি - Chief TV

2026-10-24  ডেস্ক রিপোর্ট  37 views
পুলিশের জন্য কেনা হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার গাড়ি - Chief TV

পুলিশ বাহিনীর যানবাহনসংকট দূর করতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ অভিযান পরিচালনার জন্য যানবাহন কিনতে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত যানবাহন কিনতে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত যানবাহনের তালিকায় রয়েছে ডাবল কেবিন পিকআপ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য জিপ, পুলিশ সদস্যদের যাতায়াতে বাস ও মিনিবাস, অ্যাম্বুলেন্স, প্রিজন ভ্যান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত যানবাহন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহন পুড়ে যায় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া পুরোনো অনেক গাড়ি অভিযানের সময় বিকল হয়ে পড়ে। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকা অনুযায়ীও প্রয়োজনীয় যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে নতুন যানবাহন কেনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৯০৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ। প্রতিটির প্রস্তাবিত দাম ৮৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এসব পিকআপ কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপ কেনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এ খাতে ব্যয় হবে ৬৭৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা।

প্রকল্পের আওতায় ৫২ লাখ টাকা দরে ২১৪টি মাইক্রোবাস, ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি নন-এসি বড় বাস এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মিনিবাস কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি টহল গাড়ি এবং ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি স্পিডবোট কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৩০০টি যানবাহন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের প্রাক্কলন কমিটি এসব যানবাহনের দাম নির্ধারণ করেছে। পাঁচ সদস্যের কমিটিতে পুলিশের চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন।

‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করাই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি সাঁজোয়া যান কেনার প্রস্তাব রয়েছে। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উত্তেজিত জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ২০টি জলকামান কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

জনসমাবেশ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি বিশেষায়িত জনতা নিয়ন্ত্রণের যান কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি সোয়াট ভ্যান কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ ছাড়া জরুরি অভিযান পরিচালনার জন্য ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি বিশেষায়িত টহল গাড়ি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় পরিবহনের জন্য ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি বিশেষায়িত ভ্যান এবং থানা থেকে আদালত ও আদালত থেকে কারাগারে আসামি পরিবহনের জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৫টি প্রিজন ভ্যান কেনার প্রস্তাব রয়েছে।

উচ্চগতিতে চলাচলের উপযোগী ২০০টি মোটরসাইকেল কেনার জন্য ১৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত কুকুর পরিবহনে ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি বিশেষায়িত যান এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান ও টহলের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় চলাচলের জন্য আরও ১০০টি হিল মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ছয়টি মোবাইল নজরদারি গাড়ি কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি টাকা।

উপকূলীয়, নদী ও পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত চলাচলের জন্য ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি দ্রুত সাড়াদানকারী নৌযান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। পানিতে আটকে পড়া মানুষ ও দুর্ঘটনায় পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে আরও ১৫টি উদ্ধারকারী নৌযান কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডারদের মাঠপর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০৫টি বিশেষায়িত গাড়ি এবং মৃতদেহ পরিবহনের জন্য ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি হিমায়িত ভ্যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সমাবেশে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি ছোট আকারের বহনযোগ্য যান কেনার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

এ ছাড়া পুলিশের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশিক্ষণের কাজে ঘোড়া পরিবহনের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি বিশেষ যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আরও প্রায় ৫৬টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে। এ খাতে ব্যয় করা অর্থ পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ পরিশোধ করবে বলে জানান তিনি।

প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মুশফেকুর রহমান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশের ৪৫৫টি যানবাহন পুড়ে যায়। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন। এর ফলে পুলিশের যানবাহনসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, যানবাহনের ঘাটতির কারণে নিয়মিত অভিযান ও টহল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুরোনো গাড়ি প্রায়ই অভিযানের মাঝপথে বিকল হয়ে যায়। নতুন যানবাহন কেনা হলে এ সমস্যা কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের প্রচুর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ কারণে বেশি সংখ্যায় পিকআপ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নতুন গাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। তবে গাড়িগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন কেনার অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে। তাঁদের মতে, যানবাহন কেনার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ, বিমা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনাও থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বলছেন, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী তিন বছরে এত বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া জিপ কেনার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, যানবাহনের কার্যকর ব্যবহার এবং বিশেষায়িত গাড়ি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


Share: