Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / সিলেট বিভাগ / সারাদেশ / হবিগঞ্জ / ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির - Chief TV

১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির - Chief TV

2026-10-18  ডেস্ক রিপোর্ট  49 views
১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির - Chief TV

এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে চলে পূজার্চনা। উপাসনালয় দুটি প্রায় মুখোমুখি হলেও নেই কোনো বিরোধ কিংবা সাম্প্রদায়িক বিভেদ। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ভালোবাসায় দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। পূজার সময় রং করা হয় মসজিদের সীমানাপ্রাচীর, আবার ঈদে রং করা হয় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর। ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজার এলাকার কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ ও দুর্গামন্দির।

ঢাকা-সিলেট পুরোনো মহাসড়কের পাশে অবস্থিত দুর্গামন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৯ সালে। এর প্রায় ১৯ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ। বর্তমানে মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে পাশাপাশি থাকা এই দুই উপাসনালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। পারস্পরিক সমঝোতা, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মন্দির প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় মুসল্লি, ব্যবসায়ী ও চা বাগানের মুসলমানদের উদ্যোগে এর পাশে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম বিস্তৃত হলেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় যাতে একে অপরের উপাসনায় বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য দুই পক্ষের মধ্যে রয়েছে সমঝোতা।

দুর্গাপূজার সময় নামাজ ও আজানের সময় হলে পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা তাঁদের অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার কার্যক্রম। একইভাবে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতি ও উপাসনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে চলেন।

শুধু ধর্মীয় কার্যক্রমের সমন্বয়েই নয়, স্থাপনার সৌন্দর্য রক্ষায়ও রয়েছে সহযোগিতার নজির। পূজা উপলক্ষে রং করা হয় মসজিদের সীমানাপ্রাচীর। আবার ঈদ উপলক্ষে রং করা হয় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর। পারস্পরিক সহযোগিতার এই চর্চা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করেছে।

কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, মসজিদ ও দুর্গামন্দির পাশাপাশি অবস্থিত এবং দুটির প্রবেশদ্বারও প্রায় মুখোমুখি। প্রায় ৫০ বছর ধরে পূজা কমিটির সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তাঁরা ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। পূজার সময় নামাজের সময় হলে আয়োজকেরা অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষে আবার পূজা শুরু হয়। তাঁদের মধ্যে কখনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, কামাইছড়ার এই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত সারা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত।

কামাইছড়া দুর্গামন্দিরের পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গোপাল গোয়ালা বলেন, তাঁরা হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে বসবাস করেন। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সম্মান জানান এবং সহযোগিতা করেন। ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য অটুট থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি জানান, পূজা উপলক্ষে মসজিদের সীমানাপ্রাচীর রং করা হয়। একইভাবে ঈদের সময় রং করা হয় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর। পারস্পরিক সহযোগিতার এই চর্চা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার সম্পর্ক আরও গভীর করেছে।

বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় বলেন, কামাইছড়ায় দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে। একদিকে মুসলমানরা নামাজ আদায় করছেন, অন্যদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা করছেন। তাঁর মতে, এটি দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের উজ্জ্বল উদাহরণ। কামাইছড়ার এই দৃষ্টান্ত বাহুবলসহ সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ হয়ে উঠবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা এএসআই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ ক্যাম্পের পাশেই মসজিদ ও মন্দির অবস্থিত। এলাকার মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত ভালো। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করেন। এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের মতে, কামাইছড়ার এই সম্প্রীতি শুধু পাশাপাশি দুটি উপাসনালয়ের অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার দীর্ঘদিনের চর্চার প্রতিফলন। ধর্মীয় উৎসবে একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা, উপাসনার সময়সূচি সমন্বয় করা এবং স্থাপনার সৌন্দর্য রক্ষায় সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তাঁরা সম্প্রীতির বন্ধনকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।

ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান যে সম্ভব, কামাইছড়ার মসজিদ ও মন্দির তারই বাস্তব উদাহরণ। মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে থাকা দুটি উপাসনালয় যেন নীরবে ছড়িয়ে দিচ্ছে মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বার্তা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই সৌহার্দ্যের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং কামাইছড়ার দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।


Share: