ডেঙ্গুতে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানকে হারিয়েছেন রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেকের বাসিন্দা বাবুল হক ও নাজমিন আক্তার। তাঁদের বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসান ইফতি (২৪) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছোট ছেলে মো. ইনতিসার হাসান ইয়াস (১৬) পড়ত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণিতে। দুই সন্তানের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।
নাজমিন আক্তার বলেন, ছোট মশা তাঁর পরিবারের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। সন্তানদের হারিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বনও হারিয়েছেন বলে জানান তিনি। ২৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলেকে ঘিরেই ছিল তাঁদের সব স্বপ্ন ও আনন্দ।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, প্রথমে বাবুল হক ও ছোট ছেলে ইনতিসার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ইনতিসারকে বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২১ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। সে সময় বাবুল হক ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে ছিলেন বড় ছেলে নাজমুল। বাবার হাসপাতালে থাকা এবং ছোট ভাইকে হারানোর কঠিন সময়েও মা-বাবাকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু অক্টোবরে নাজমুলেরও ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
নাজমিন আক্তার জানান, স্বামীর অসুস্থতা নিয়ে তিনি তখন দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আশঙ্কা করেছিলেন, স্বামীর কিছু হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর মধ্যেই দুই সন্তানকে হারাতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, ছোট ছেলে মজা করে নিজেকে পরিবারের ‘সিনিয়র’ বলত। অথচ সেই ছেলেই সবার আগে চলে গেল।
সন্তানদের নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি মনে পড়ছে নাজমিনের। বড় হয়ে যাওয়ার পরও ছেলেদের নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন তিনি। ছোট ছেলে রান্না করতে ভালোবাসত। তার রান্না করা খাবার এখনো ফ্রিজে রাখা আছে। মা-ছেলেরা একসঙ্গে গল্প করতেন, হাঁটার সময় ছেলেরা মায়ের হাত ধরে থাকত। ঘুমানোর সময় ছাড়া যেন মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকতেই চাইত না তারা।
পূজার ছুটিতে ১৮ অক্টোবর পরিবারের পঞ্চগড়ের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। বড় ছেলে নিজেই যাত্রার টিকিট কেটে রেখেছিল। দুই ভাইয়ের মামার সঙ্গে কলকাতায় যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। সে জন্য দুজনের পাসপোর্টও করা হয়েছিল। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার সেই পরিকল্পনা আর পূরণ হয়নি। দুই সন্তানকে হারিয়ে তাঁদের মরদেহ নিয়ে পঞ্চগড়ে ফিরতে হয়েছে মা-বাবাকে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বড় ছেলে মাকে বলেছিল, তাকে ছাড়া কীভাবে থাকবেন। আইসিইউতে নেওয়ার আগে মা-বাবাকে ভালো থাকার কথাও বলেছিল নাজমুল। সেই স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজমিন। দুই সন্তানের চিকিৎসায় প্রায় নয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি। চিকিৎসকদের কাছে তাঁর একটাই অনুরোধ ছিল—খরচের কথা না ভেবে সন্তানদের সুস্থ করে দিতে। কিন্তু সেই আকুতি পূরণ হয়নি।
বাবুল হক সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর একই বাহিনীতে বেসামরিক পদে কাজ করছেন। নিজের ডেঙ্গু এবং পরপর দুই সন্তানকে হারানোর ঘটনায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন নাজমিন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৩১ জন। শুধু অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৮৬ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৪৩ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে।
দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেছেন, ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ নেই, গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, সারা দেশে বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সরকার গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি শুরু করেছে। এর লক্ষ্য জনসচেতনতা বাড়ানো, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ডেঙ্গুতে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে মৃত্যুর পরিসংখ্যানের চেয়ে ব্যক্তিগত শোক ও ক্ষতির যন্ত্রণা অনেক গভীর। বাবুল হক ও নাজমিন আক্তারের পরিবারের মতো বহু পরিবারকে এই রোগের কারণে আপনজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।