Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / জাতীয় / সুনীল অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় সম্পদ সামুদ্রিক শৈবাল - Chief TV

সুনীল অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় সম্পদ সামুদ্রিক শৈবাল - Chief TV

2026-08-31  ডেস্ক রিপোর্ট  32 views
সুনীল অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় সম্পদ সামুদ্রিক শৈবাল - Chief TV

সমুদ্রের পানিতে বেড়ে ওঠা সামুদ্রিক শৈবাল বা ‘সি-উইড’ উপকূলীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা অবহেলিত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর রয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। প্রক্রিয়াজাত করে সামুদ্রিক শৈবাল থেকে খাদ্য, ফুড সাপ্লিমেন্ট, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা সম্ভব। গবেষকদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে এ সম্পদের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের সুনীল অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

সামুদ্রিক শৈবালের চাষ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শৈবাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনী তৈরিতে তারা সাফল্য পেয়েছেন। বর্তমানে এসব পণ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম চলছে।

গবেষকরা বলছেন, সামুদ্রিক শৈবালে ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-থ্রি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। সঠিকভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এগুলো খাদ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য তৈরিতেও শৈবাল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

পবিপ্রবির ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন অনুষদের খাদ্য মাইক্রোবায়োলজি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলে খাদ্যপণ্যের বৈচিত্রের পাশাপাশি এর বাণিজ্যিক ব্যবহারও বাড়ানো সম্ভব।

সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে আইসক্রিম, মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, সসেজ ও জেলিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুশির অন্যতম উপকরণ ‘নরি শিট’ও সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি হয়। বিভিন্ন ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ট্যাবলেট তৈরিতেও শৈবালের ব্যবহার রয়েছে। একইভাবে সাবান, উপটানসহ বিভিন্ন প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা যায়।

লুথ্যারন হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তারিয়া জান্নাত বলেন, সামুদ্রিক শৈবালে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান মানবদেহের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষকদের মতে, সামুদ্রিক শৈবালের বাণিজ্যিক চাষ উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। উপকূলের অনেক মানুষ মাছ ধরা ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব পেশায় নানা ধরনের ঝুঁকি থাকায় শৈবাল চাষ হতে পারে বিকল্প আয়ের একটি ক্ষেত্র।

অল্প পরিসরে শুরু করে পর্যায়ক্রমে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূলীয় মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুধু চাষ নয়, শৈবাল সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণ ঘিরেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

পবিপ্রবির ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, সামুদ্রিক শৈবাল শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, বিভিন্ন শিল্প ও প্রসাধনসামগ্রীর কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্য এলেও দেশে সামুদ্রিক শৈবাল এখনো বড় পরিসরে বাণিজ্যিক খাত হিসেবে গড়ে ওঠেনি। শুধু শৈবাল উৎপাদন করলেই হবে না, এর সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন করতে হবে। শৈবাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরি করে বাজারজাত করা গেলে এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে চাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নত চাষপদ্ধতি, মানসম্মত উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদিত শৈবালের বাজার নিশ্চিত করা জরুরি। বাজার তৈরি না হলে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভবান হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পবিপ্রবির মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি উপকূলের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করলে সামুদ্রিক শৈবালকে ঘিরে নতুন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। খাদ্য, পুষ্টি ও প্রসাধন খাতের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উপকূলীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এ সমুদ্রসম্পদ। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে অবহেলিত এই শৈবালই হয়ে উঠতে পারে উপকূলের মানুষের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।


Share: