কক্সবাজারের উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনেরা মরদেহ নিতে হাসপাতালে ছুটে এলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এখনই তাঁদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছে না। আগুনে পুড়ে মরদেহের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। তবে কোন মরদেহ কার, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন নারী, একজন শিশু ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তাঁদের পরিচয়ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শনিবার সকালে কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয় এবং দগ্ধ হন আরও ছয়জন। আহতদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উড়োজাহাজে ঢাকায় পাঠানো হয়। অন্য দুজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, আগুনে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। এরপর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার। গত বৃহস্পতিবার দুই বান্ধবী আইরীন জাহান ও ইসরাত জাহানের সঙ্গে তিনি রিসোর্টটিতে ওঠেন। আইরীন জানান, শনিবার ভোরে তিনি ও ইসরাত সূর্যোদয় দেখতে সমুদ্রসৈকতে গেলেও নাসরিন ঘুমানোর জন্য রিসোর্টেই থেকে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তাঁরা রিসোর্টে আগুন জ্বলতে দেখেন। তখন তাঁদের কিছুই করার ছিল না।
খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসেন নাসরিনের স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। তিনি রিসোর্ট ও হাসপাতাল—দুই জায়গাতেই স্ত্রীকে খুঁজেছেন। কিন্তু মরদেহের অবস্থা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দেওয়ান ফয়সাল জানান, নাসরিন আশুলিয়ার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ছয় বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়।
হাসপাতালের সামনে এখনো অবস্থান করছেন নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা। তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রিসোর্টের মালিক মো. তানভির ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় উখিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে।
আগুনের কারণ ও রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, রিসোর্টটি অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। এটি অপসারণের জন্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস একাধিকবার নোটিশ দিয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরও সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, রিসোর্ট নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং সেখানে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও ছিল না। সমুদ্রের তীব্র বাতাসের কারণে কাঠের স্থাপনাটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, পানির পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো মৌলিক ব্যবস্থাও সেখানে ছিল না বলে জানান তিনি।