মানুষের মতো দেখতে ও চলাফেরা করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট ‘অপটিমাস’-এর প্রাথমিক উৎপাদন শুরু করেছে মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্রিমন্ট কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব রোবট। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের ঘোষণা অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে ২০২৭ সালের শেষ দিকে বাইরের গ্রাহকদের কাছে রোবট সরবরাহ শুরু হতে পারে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) অপটিমাসের উৎপাদন শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন ইলন মাস্ক। এর আগে বুধবার (২১ অক্টোবর) টেসলার তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশ ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান।
মাস্ক বলেন, ফ্রিমন্ট কারখানায় বড় পরিসরে উৎপাদনের উপযোগী লাইনে প্রাথমিকভাবে রোবট তৈরি শুরু হয়েছে। তবে উৎপাদন শুরু হওয়ার অর্থ এই নয় যে রোবটগুলো এখনই সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কাজ এখনো চলছে।
টেসলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্রিমন্ট কারখানার একটি অংশ অপটিমাস তৈরির জন্য নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। আগে সেখানে মডেল এস ও মডেল এক্স বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করা হতো। এখন সেই জায়গায় রোবট উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থার বড় অংশ স্থাপন করা হলেও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, রোবটের নকশা ও তৈরির পদ্ধতিতে এখনো পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এ কারণে শুরুর দিকে উৎপাদনের গতি তুলনামূলক ধীর থাকতে পারে।
ইলন মাস্কের লক্ষ্য, আগামী এক বছর বা তার কিছু বেশি সময়ের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার অপটিমাস তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা। সে হিসাবে বছরে প্রায় ১০ লাখ রোবট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে ফ্রিমন্ট কারখানায়। তবে এটি ভবিষ্যৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা। বর্তমানে কতটি রোবট তৈরি হয়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করেনি টেসলা।
অপটিমাস মূলত দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম মানুষের আকৃতির রোবট। পুনরাবৃত্তিমূলক, শারীরিকভাবে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষকে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে এটি তৈরি করছে টেসলা। ভবিষ্যতে কারখানা, গুদাম ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে এসব রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ঘরোয়া কাজেও ব্যবহারযোগ্য করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
তবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আগে অপটিমাসকে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। মানুষের হাতের মতো সূক্ষ্মভাবে বস্তু ধরা, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো এবং বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা আরও উন্নত করতে হচ্ছে। পাশাপাশি রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মাস্কের মতে, কয়েক সপ্তাহ বা এক মাস ব্যবহারের পর কোনো রোবট অচল হয়ে গেলে তা বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হবে না। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রোবটের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাও টেসলার অন্যতম লক্ষ্য।
এ জন্য ‘অপটিমাস একাডেমি’ নামে একটি প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে রোবটগুলোকে বিভিন্ন বাস্তব কাজ অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাস্কের মতে, হিউম্যানয়েড রোবটকে দক্ষ করে তুলতে পর্যাপ্ত বাস্তব কাজের তথ্য সংগ্রহ করা বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে অপটিমাসে টেসলার পরবর্তী প্রজন্মের এআই৫ চিপ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। মাস্কের প্রত্যাশা, ২০২৭ সালের এপ্রিলের দিকে এই চিপ রোবটে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তাঁর দাবি, নতুন চিপ রোবটের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা বাড়াবে। তবে এ সময়সূচি ও প্রত্যাশিত সক্ষমতা এখনো বাস্তবে নিশ্চিত হয়নি।
অপটিমাস বাজারজাত করার সময়সূচি নিয়ে মাস্ক জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ টেসলার বাইরের গ্রাহকদের কাছে রোবট সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য গ্রাহক হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য রোবটটির দাম, বাজারে আসার নির্দিষ্ট সময় কিংবা কোন দেশে প্রথম বিক্রি শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
বিশ্বজুড়ে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। টেসলার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান শিল্পকারখানা ও সরবরাহব্যবস্থায় মানুষের কাজের উপযোগী রোবট তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। তবে বাস্তব কর্মপরিবেশে দীর্ঘ সময় নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার সক্ষমতা এখনো এ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অপটিমাসের মতো রোবট ভবিষ্যতে শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কারখানা ও গুদামের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে রোবট ব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এর ফলে কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে বা মানুষের কাজের ধরনে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
অপটিমাসের উৎপাদন শুরুর মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাইরেও রোবটিকস প্রযুক্তিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে আরও এক ধাপ এগোল টেসলা। তবে প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটানো এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে রোবটের কার্যকারিতা প্রমাণের ওপর।