ইসরায়েলের আগামী মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচন ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবার ক্ষমতা হারাতে পারেন বলে ধারণা করছেন অনেকে। তবে বিরোধীরা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের দল ইয়াশার কয়েকটি জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে পেছনে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে তাঁর এই প্রকাশ্য সমর্থন ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মিত্রদেশের নির্বাচনে প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান না নেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতির অংশ। তবে ট্রাম্প সেই রীতি অনুসরণ করেননি। নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি ইরানকে নতুন করে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্য, ইরান দ্রুত আচরণ না বদলালে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজ শেষ করবে।
ইসরায়েলি ভোটারদের উদ্দেশে ট্রাম্প আরও বলেছেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে ইরান মোকাবিলার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে একাই নিতে হতে পারে, যা করতে তিনি আগ্রহী নন। এভাবে ইসরায়েলের নির্বাচনের সঙ্গে ইরানবিষয়ক মার্কিন সহযোগিতার প্রশ্নটিও জুড়ে দিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সমর্থনকে নিজের নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে ভোটারদের বোঝাতে চাইছেন, ইরানের হুমকি মোকাবিলার অসমাপ্ত কাজ তাঁরা একসঙ্গে শেষ করতে পারবেন।
তবে ট্রাম্পের এই অবস্থান ভালোভাবে নেননি ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতিকেরা। গাদি আইজেনকট জানিয়েছেন, নির্বাচনে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ তিনি জানিয়েছিলেন। কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সে সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের ভোটারদেরই নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
আরেক বিরোধী নেতা আভিগদর লিবারম্যানের অভিযোগ, নেতানিয়াহুকে পুতুলের মতো ব্যবহার করে ইসরায়েল পরিচালনা করা ট্রাম্পের জন্য সুবিধাজনক।
ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী সম্ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। সমর্থন ঘোষণার পরদিন চ্যানেল টুয়েলভের এক জরিপে নেতানিয়াহুর দলের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো বাড়তি সুবিধা দেখা যায়নি। জরিপে অধিকাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না।
ইসরায়েলের দৈনিক হারেৎজ-এর ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক ইশাই হালপারও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না। তাঁর মতে, ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর সমর্থক, তা আগে থেকেই সবার জানা। নতুন বিষয় হলো, এত দিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সমর্থন জানিয়েছেন। এতে ডান বা বাম শিবিরের ভোটাররা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সিদ্ধান্ত বদলাবেন বলে তিনি মনে করেন না।
ইসরায়েলের নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন কতটা কাজে আসবে, তা ভোটের পরই বোঝা যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও ইসরায়েল ও ইরান গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন হামলার সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। তবে সামরিক প্রস্তুতি মানেই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তারপরও নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের বড় উদ্বেগের একটি হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। ইরান যুদ্ধ সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে। ফলে দূরের যুদ্ধ এখন মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
একাধিক প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার বিরোধিতাকে নির্বাচনী প্রচারের অংশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগানের সিনেট পদপ্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। ইসরায়েলি সরকারের কঠোর সমালোচক এই প্রার্থী যুদ্ধের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মার্কিন নাগরিকদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছেন।
এল-সাইয়েদের অবস্থানকে আক্রমণের হাতিয়ার করেছেন রিপাবলিকানরা। ট্রাম্প তাঁকে ‘উগ্রপন্থী’ ও ‘সন্ত্রাসবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর জবাবে এল-সাইয়েদের বক্তব্য, ভোটারদের প্রকৃত সমস্যা থেকে মনোযোগ সরাতেই তাঁর পরিচয় ও বিশ্বাসকে সামনে আনা হচ্ছে।
নিউইয়র্কের কংগ্রেস পদপ্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে আরও স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন পাওয়া এই প্রার্থী গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর শাসনব্যবস্থাকে বর্ণবাদী বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর প্রচারণার স্লোগান, ‘বেবিজ, নট বম্বস’—অর্থাৎ বোমার পরিবর্তে শিশুদের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হোক।
নিউইয়র্কের আরেক কংগ্রেস পদপ্রার্থী ক্লেয়ার ভালদেজও ইসরায়েলে সব ধরনের মার্কিন সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে। একই অঙ্গরাজ্য থেকে কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ব্রাড ল্যান্ডার গাজার ঘটনাকে গণহত্যা বলে উল্লেখ করেছেন এবং আক্রমণাত্মক মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান শেভালিয়ের মতো নয়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র কেনার সুযোগ রাখার পক্ষে তিনি।
অবশ্য ইসরায়েলের সমালোচনা করলেই নির্বাচনে জয় পাওয়া নিশ্চিত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসন এখনো অধিকাংশ মার্কিন ভোটারের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তবে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে গাজা, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা এবং নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—দূরের যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও নিজেদের শহরের হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসন খাতে অর্থের সংকট কেন থাকবে? ইসরায়েলকে সমর্থন, ইরানকে মোকাবিলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট—এই তিনটি বিষয়ই এখন মার্কিন রাজনীতিতে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।