Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / জাতীয় / ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য - Chief TV

ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য - Chief TV

2026-08-24  ডেস্ক রিপোর্ট  40 views
ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য - Chief TV

ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা, নজরদারি, হামলা, পালানোর প্রস্তুতি এবং ভারতে আত্মগোপন নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই হাদির চলাচল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন প্রধান শুটার হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ। অনুসারী, ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর ছদ্মবেশে তারা হাদির কাছাকাছি অবস্থান করে তার নিয়মিত চলাচল, গন্তব্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানান, ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭-৮ জনের একটি বৈঠকেও ফয়সালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। এটিকে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

হামলার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট পর মোটরসাইকেলে করে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের কাছের খলিল হোটার গলিতে অবস্থান নেন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা তারা সেখানে ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নামাজ শেষে হাদি বের হয়ে অটোরিকশায় উঠলে মোটরসাইকেলে করে তাকে অনুসরণ করা হয়। দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর তারা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনের দিকে পালিয়ে যান।

গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

তদন্তে ফয়সালকে প্রধান শুটার এবং আলমগীরকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, সিডিআর, আইএমইআই, সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহভাজনদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয় এবং পালানোর প্রস্তুতি নিয়েও তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় গিয়ে স্ত্রী, মা ও দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন। হামলার আগে ও পরে একাধিক মোবাইল নম্বর ও হ্যান্ডসেট ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু নম্বর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় ছিল এবং কিছু নম্বর অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত ছিল বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলার পর ফয়সাল ও আলমগীরের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর বিষয়েও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের দাবি, দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় তারা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ স্থানীয় কয়েকজন তাদের সীমান্ত পারাপার ও ভারতে অবস্থানে সহায়তা করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন ও বেআইনিভাবে অবস্থানের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ওই জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, অর্থদাতা এবং ভারতে সহযোগিতাকারীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

এদিকে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে তিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন। ভারতে নিজের পরিচয় গোপন করে ভিন্ন নামে আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহের তথ্যও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাদি হত্যার ২১ দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ ওই অভিযোগপত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করে নারাজি আবেদন করে। তাদের অভিযোগ ছিল, হামলায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করা হয়েছে।

এরপর মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে সিআইডি হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, অর্থের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপার এবং ভারতে পালানোর পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে। তদন্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

ভারতে গ্রেপ্তার ফয়সাল ও আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা থাকায় সরাসরি প্রত্যর্পণ সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, বাংলাদেশের পাঠানো নথি এবং দুই দেশের আইনি কাঠামোর সামঞ্জস্যসহ বিভিন্ন বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।

এদিকে ভারত থেকে তথ্য সংগ্রহ, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সীমান্ত পারাপার ও সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ১৮ বার পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও ওই তারিখেও তা জমা পড়েনি।

ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংগঠনটি আন্দোলনে যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।


Share: