কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় দুই কিশোরসহ চারজনকে অভিযুক্ত করে এই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান। তিনি জানান, গত ২০ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো. সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর। শিশু আইন অনুযায়ী, অভিযোগপত্রে ওই দুই কিশোরকে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট এবং ৩৪ ধারায় যৌথভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব আহমেদের নেতৃত্বে তদন্ত সম্পন্ন হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলাম তুহিন ছিলেন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত। অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনায় সিয়ামেরও সম্পৃক্ততা ছিল। এ ছাড়া তিনজনের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তের সময় প্রধান অভিযুক্ত তুহিন এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অপর আসামি সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
নিহত অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অপ্রতিমকে ঘিরেই তাঁদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তাঁদের একমাত্র চাওয়া, দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
তবে অভিযোগপত্রের বিস্তারিত এখনো পুরোপুরি জানা হয়নি বলে জানান তিনি। বিশেষ করে অভিযুক্ত দুই কিশোরের বয়স নিয়ে শুরু থেকেই পরিবারের প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগপত্রের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান অপ্রতিমের বাবা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই ৩১ দিনের মাথায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি শেষে রোববার আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এগোবে বলে জানান তিনি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন জানান, অপ্রতিমের কাছে থাকা একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তদন্তে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়।