খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৭ বছরে বদলে দিয়েছে একটি পিছিয়ে থাকা জনপদের শিক্ষার চিত্র। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি যাতায়াতের অসুবিধা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পর পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে উল্টাছড়ি ও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে পানছড়ি বাজারের দিকে যেতে হতো। দূরত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন ছিল। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পক্ষে বাড়তি শিক্ষা ব্যয় বহন করাও সম্ভব হয়ে উঠত না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে যেত।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯৯ সালে স্থানীয় উদ্যোগে উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। তাঁর উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে এলাকার শিক্ষার পরিবেশ বদলে দিতে শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাছেই তুলনামূলক কম খরচে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ পেতে শুরু করে।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং পড়াশোনায় উৎসাহিত করতেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
২০১০ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। বর্তমানে উল্টাছড়ি ছাড়াও মরাটিলা, জিয়ানগর, মধ্যনগর, মোল্লাপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার শত শত শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।
বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। কেউ কেউ নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ফলে উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় এখন শুধু একটি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, আশপাশের কয়েকটি এলাকার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আজকের জনবাণী পত্রিকার পানছড়ি প্রতিনিধি আল-আমিন হোসেন বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে যাতায়াতের অসুবিধা ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পর অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার শত শত শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকার শিক্ষার পরিবেশ বদলে দিতে পারে, উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় তার উদাহরণ।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর এলাকায় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। একসময় যেখানে নানা প্রতিকূলতায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেমে যেত, এখন সেখানকার শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় তাই স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি জনপদের শিক্ষার অগ্রযাত্রার প্রতীক। ভবিষ্যতে আরও উন্নত শিক্ষা পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।