প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং সরকারের কাজের পরিধি বিবেচনায় বর্তমান মন্ত্রিসভার কলেবর আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই অথবা আগামী অক্টোবরের শুরুতে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল ও সম্প্রসারণ হতে পারে। সরকারের কার্যক্রমে গতি আনা, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্মমূল্যায়ন এবং বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বিএনপি ও জনপ্রশাসনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৫১ জন। এর মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১১ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের আলোচনা রয়েছে। তবে এর চূড়ান্ত সময়সূচি বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীই বলতে পারবেন।
সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় এর আগে মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক রদবদল করা হয়েছিল। ওই পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সরকারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের প্রাথমিক ফল হিসেবে দেখলেও অন্যরা শূন্য পদ পূরণ, দপ্তর পুনর্বণ্টন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
এরপর মন্ত্রিসভার গঠন ও দক্ষতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে একই সঙ্গে পূর্ণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা থাকায় দায়িত্ব বণ্টনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার তুলনামূলক ছোট কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি থাকায় সেখানে নতুন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং অপেক্ষাকৃত নবীন নেতাদের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সম্ভাব্য নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এ বি এম আশরাফ উদ্দীন নিজান, বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং মো. আবুল কালাম (চৈতি কালাম) প্রমুখের নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
সম্ভাব্য রদবদলের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের আচরণ নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। দুর্যোগকালীন সময়ে পরীক্ষা নেওয়া, বিভিন্ন বক্তব্য ও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তার পরিবর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন অথবা শিক্ষক নেতা ও সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়ার হাতে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বিভিন্ন বক্তব্য ও কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে মূল বিষয়ের বাইরে কথা না বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেও সূত্রের দাবি। এছাড়া একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত ও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
একই সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর দায়িত্বের পরিধি কমানোর বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর কাছ থেকে একটি দপ্তর সরিয়ে তা সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সামগ্রিকভাবে তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানো এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তনের গুঞ্জনও রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর সার্কিট হাউস সড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর অভিযোগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ মামলা করেছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে আশানুরূপ অগ্রগতি না থাকায় বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াসিনের দপ্তর পরিবর্তন বা মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, পরিবর্তন হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীই ভালো বলতে পারবেন। পরিবর্তন হলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাকে যুক্ত করা হবে, সে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুনর্গঠন বা রদবদল দল ও সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। প্রয়োজনের তাগিদেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারপ্রধান প্রয়োজন মনে করলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।