লাঠিতে ভর দিয়ে কাদামাখা রাস্তা পার হচ্ছেন এক বৃদ্ধ। একটু এগোতেই কাদায় আটকে থাকা ভ্যান। যাত্রীদের নামিয়ে কয়েকজন মিলে সেটি ঠেলে তোলার চেষ্টা করছেন। কোথাও আবার খানাখন্দ এড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মোটরসাইকেল। বৃষ্টি বাড়লেই এমন দৃশ্য যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে ওঠে জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে।
আক্কেলপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীকৃষ্টপুর স্কুলপাড়া গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবারের যাতায়াতের প্রধান ভরসা প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি কাঁচা রাস্তা। বর্ষা এলেই কাদা ও পানিতে রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে স্কুল-কলেজ, বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কর্মস্থলে যেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন স্থানে জমে রয়েছে পানি। কোথাও কয়েক ইঞ্চি গভীর কাদা, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ভ্যানের চাকা কাদায় দেবে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে যাত্রীদের নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে হচ্ছে। পরে চালক ও যাত্রীরা মিলে ভ্যান ঠেলে কাদা থেকে তুলছেন।
মোটরসাইকেল চালকরাও পড়েছেন বিপাকে। পিচ্ছিল কাদা ও খানাখন্দের কারণে ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। পথচারীদের অনেকে আবার জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলাউদ্দীন (৬৫) বলেন, বৃষ্টি হলে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়ে। বয়সের কারণে কাদায় পা পিছলে পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোও কঠিন। কিন্তু প্রয়োজনের কারণে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।
ভ্যানচালক খাদেম (৫২) বলেন, কাদায় চাকা আটকে গেলে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় সবাই মিলে ভ্যান ঠেলে নিতে হয়। এই রাস্তায় ভ্যান চালানো অত্যন্ত কষ্টকর।
গৃহবধূ শাহিদা বেগম (৩২) বলেন, গর্ভবতী বা গুরুতর অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি ভয় হয়। মাঝপথে কাদায় গাড়ি আটকে গেলে জরুরি মুহূর্তে কী হবে, সেই চিন্তাই তাদের আতঙ্কিত করে।
স্থানীয়দের দাবি, গত বর্ষায় রাতে এক গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় কাদায় ভ্যান আটকে যায়। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক গিয়ে ভ্যানটি ঠেলে মূল সড়কে তুলে দেন। সেই ঘটনার পর থেকে জরুরি রোগী পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কৃষক সেকেন্দার (৪২) জানান, কাঁচা রাস্তার কারণে ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে ভ্যানচালকদের বেশি ভাড়া দিতে হয়। রাস্তার অবস্থা দেখে অনেক চালক আসতেও চান না। এতে পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হয়।
স্থানীয়রা জানান, রাস্তার এই দুরবস্থা নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে একই ভোগান্তি পোহাতে হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। বৃষ্টি শুরু হলেই অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা।
স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম চপল বলেন, রাস্তাটির সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যায়। পৌরসভার প্রকৌশলীরা নজর দিলে এ রাসহ এলাকার অন্যান্য রাস্তাগুলোরও উন্নয়ন করা সম্ভব।
তবে স্থানীয়দের দুর্ভোগ নিরসনে আশ্বাস দিয়েছেন আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক আবিদা খানম বৈশাখী। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তা সংস্কারের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এটি টেন্ডারের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রতিবছর বর্ষা আসে, কাদা জমে আর বাড়ে মানুষের দুর্ভোগ। বর্ষা শেষে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও থেকে যায় পুরোনো সমস্যা। এখন গ্রামবাসীর প্রত্যাশা, সংস্কারের আশ্বাস যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত ৫০০ মিটার সড়কটির সংস্কার হলে বর্ষার কাদায় আটকে থাকা আড়াইশ পরিবারের চলাচলে ফিরতে পারে স্বস্তি।