একসময় কাকডাকা ভোর কিংবা গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে নওগাঁর গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ভেসে আসত ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ। উঠান কিংবা রান্নাঘরের পাশে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করা কাঠের ঢেঁকি ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধান ভানা থেকে শুরু করে চালের গুঁড়া তৈরি—সবকিছুতেই এর ব্যবহার ছিল। সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে সেই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
একসময় অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে নতুন ধানের চাল ও গুঁড়া তৈরিতে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ঢেঁকির ব্যবহার বেড়ে যেত। ঢেঁকিতে ধান ভানার পাশাপাশি নতুন চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হতো দুধ পিঠা, তেলের পিঠা, চিতই, ফিরনি ও পায়েস। নবান্নকে ঘিরে আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া ও আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে তৈরি হতো এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। ঢেঁকির শব্দও ছিল সেই উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।
নওগাঁর প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, আগে ভোরে ঢেঁকির শব্দ শুনেই অনেকের দিনের কর্মব্যস্ততা শুরু হতো। বিশেষ করে গ্রামের নারীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ঢেঁকির সম্পর্ক ছিল গভীর। ধান ভানা ও চালের গুঁড়া তৈরির কাজে নারীরা একসঙ্গে অংশ নেওয়ায় পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্কও দৃঢ় হতো।
তবে আধুনিকতার সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এখন রাইস মিল ও আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে অল্প সময়ে কম খরচে ধান ভাঙানো ও চালের গুঁড়া তৈরি করা যায়। ফলে ধীরে ধীরে ঘর থেকে হারিয়ে গেছে ঢেঁকি। একসময় বাবলা বা কড়ই কাঠ দিয়ে তৈরি এসব ঢেঁকি এখন অনেক বাড়ির গোয়ালঘর কিংবা অব্যবহৃত কোণে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
ঢেঁকির ব্যবহার কমে যাওয়ার ফলে গ্রামীণ নারীদের একটি ঐতিহ্যবাহী আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও দরিদ্র নারীরা আগে অন্যের বাড়িতে ধান ভেনে পারিশ্রমিক পেতেন। এখন সেই সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকে দিনমজুরিসহ বিভিন্ন কঠিন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আধুনিক যন্ত্র মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার বহু পুরোনো সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য। ঢেঁকিছাটা চাল ও এর সঙ্গে যুক্ত ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মেলা, জাদুঘর কিংবা কুটিরশিল্পের মাধ্যমে ঢেঁকির ব্যবহার ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি ঢেঁকিছাটা চালের বাজার তৈরি করা গেলে এই ঐতিহ্য কিছুটা হলেও ধরে রাখা সম্ভব।
নওগাঁর গ্রামাঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসা ঢেঁকি এখন কেবল একটি পুরোনো কাঠের যন্ত্র নয়; এটি গ্রামীণ জীবন, নবান্ন, পিঠা-পুলি ও সামাজিক বন্ধনের এক জীবন্ত স্মৃতি। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একসময় হয়তো ঢেঁকির সেই পরিচিত ধুপধাপ শব্দ শুধু গল্পেই শোনা যাবে।