নিজের ছোট্ট একটি দোকান। আয়ও সীমিত। তবু অসহায় ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সেবায় পিছপা হন না কুড়িগ্রামের রায়হানুর রহমান কাজল। কখনো তাঁদের গোসল করিয়ে দেন, কখনো কেটে দেন হাত-পায়ের নখ। আবার কখনো নিজের হাতে খাবার তুলে দেন। বিনিময়ে কোনো প্রত্যাশা নেই তাঁর। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েই খুঁজে পান মানসিক তৃপ্তি। এভাবে প্রায় ২১ বছর ধরে মানবসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন রাজারহাট উপজেলার এই ব্যক্তি।
রায়হানুর রহমান কাজলের বয়স ৩৯ বছর। তিনি উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের বেটুবাড়ি গ্রামের মৃত গমির উদ্দিন আহমেদ ও শাহের বানুর ছেলে। নাজিমখান বাজারে তাঁর ছোট একটি ভুসির দোকান রয়েছে। সেখানে ভুসি, মাছের খাবার ও ওষুধ বিক্রি করে চলে তাঁর সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের সেবায় প্রতি মাসে নিজের পকেট থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা ব্যয় করেন তিনি।
কাজলের এ মানবিক উদ্যোগের শুরু ২০০৫ সালে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাজিমখান বাজারে আসার সময় তিনি দেখতেন, অনেক মানুষ অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের হাত-পায়ের নখ বড় হয়ে থাকত, পরিচর্যার অভাবে জীবন কাটত অবহেলায়। এসব দৃশ্য তাঁকে ব্যথিত করত। সেই ভাবনা থেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০১১ সালে বাজারে দোকান দেওয়ার পর আরও নিয়মিতভাবে সেবামূলক কাজ শুরু করেন।
এরপর থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের গোসল করানো, নখ কেটে দেওয়া, চুল-দাড়ি ছেঁটে দেওয়া, খাবার খাওয়ানো এবং নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার মতো কাজ করে আসছেন কাজল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১২০ জনকে সেবা দিয়েছেন। বাজারে কিংবা আশপাশে যেখানেই তাঁদের দেখা পান, সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। বর্তমানে নিয়মিত চারজনের দেখাশোনা করছেন তিনি।
কাজলের এ পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর স্ত্রী মারুফা আক্তার লিপি। স্বামীর উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে বাড়িতে আসা মানুষদের খাবারের ব্যবস্থাও করেন তিনি। মারুফা বলেন, স্বামীর এ কাজকে তিনি সব সময় সমর্থন করেন। মাঝেমধ্যে কাজল কয়েকজনকে বাড়িতে নিয়ে এলে তাঁদের খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন।
কাজলের মানবিক উদ্যোগের অন্যতম উদাহরণ রাসেল। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী এই ছেলেকে প্রায় ১০ বছর ধরে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছেন তিনি। রাসেলের খাবার, পোশাক ও দেখাশোনার দায়িত্ব নিজের অর্থেই পালন করছেন। রাসেল নিজে পোশাক পরতে পারেন না, তাই দৈনন্দিন কাজেও সহযোগিতা করেন কাজল। তাঁকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছেন। কোথাও দাওয়াতে গেলে রাসেলকেও সঙ্গে নিয়ে যান। নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখেন তাঁকে।
নাজিমখান বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের কাছেও কাজলের এই উদ্যোগ পরিচিত। রামকৃষ্ণ গ্রামের বাসিন্দা মো. রেজা বলেন, ছোটবেলা থেকেই কাজলকে বাজারে আসা অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে দেখছেন তিনি। তাঁদের হাত-পায়ের নখ কেটে দেওয়া, গোসল করানো এবং খাবার খাওয়ানোর পর বিদায় করেন কাজল।
কাজলের দোকানের পাশের দর্জি এমদাদুল হক বলেন, যেকোনো এলাকার মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ নাজিমখান বাজারে এলে কাজল তাঁদের খোঁজ নেন। রাসেল সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকেন। রাসেলের দৈনন্দিন কাজেও সহযোগিতা করেন তিনি।
নাজিমখান ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর সবুর মন্ডল বলেন, অনেক মানুষ মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের অবহেলা করেন। কিন্তু কাজল তাঁদের পরিচ্ছন্ন থাকতে ও নিজেদের যত্ন নিতে সহযোগিতা করছেন। তাঁর কাছে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
নাজিমখান ছালামিয়া নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাজলকে মানবসেবায় নিয়োজিত থাকতে দেখছেন তিনি। অনেকে যাঁদের এড়িয়ে চলেন, কাজল তাঁদের আপন করে নিয়েছেন।
নিজের দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগ সম্পর্কে রায়হানুর রহমান কাজল বলেন, তিনি তাঁদের আপনজন মনে করেন। তাঁদের সেবা করলে মনের তৃপ্তি পান। যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন এ কাজ চালিয়ে যেতে চান।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. ববিতা খাতুন বলেন, সমাজে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও তাঁদের সেবা করা মহৎ কাজ। যখন অনেকে তাঁদের এড়িয়ে চলেন বা অবহেলা করেন, তখন যাঁরা মমতা নিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ান, তাঁরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু।