Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / ময়মনসিংহ বিভাগ / সারাদেশ / ময়মনসিংহ / আধুনিকতার ছোঁয়ায় চিরচেনা মাটির ঘর আজ বিলুপ্তির পথে - Chief TV

আধুনিকতার ছোঁয়ায় চিরচেনা মাটির ঘর আজ বিলুপ্তির পথে - Chief TV

2026-10-31  ডেস্ক রিপোর্ট  26 views
আধুনিকতার ছোঁয়ায় চিরচেনা মাটির ঘর আজ বিলুপ্তির পথে - Chief TV

সময়ের পরিবর্তন, আধুনিকতার ছোঁয়া আর মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্যপট। একসময় গ্রামের মানুষের প্রধান আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত মাটির ঘর ও ছনের ঘর এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব ঘরবাড়ি।

একসময় গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই দেখা যেত মাটির দেয়াল আর ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এসব ঘর থাকত তুলনামূলক শীতল, আবার শীতকালে ভেতরে অনুভূত হতো উষ্ণতা। স্থানীয় মাটি, বাঁশ, কাঠ, খড় ও ছন দিয়ে তৈরি হতো এসব ঘর। গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব শ্রম, পারিবারিক সহযোগিতা এবং সহজলভ্য উপকরণে গড়ে উঠত ঐতিহ্যবাহী এসব আবাসস্থল।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিরচেনা দৃশ্য ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। মাটির ঘর ও ছনের ঘরের জায়গা দখল করছে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের তৈরি পাকা বাড়িঘর। কোথাও কোথাও নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। উন্নত জীবনযাপন, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে মানুষ এখন পাকা বাড়ি নির্মাণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সচেতন নাগরিকদের মতে, আধুনিকতা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় ‘গরিবের এসি’ নামে পরিচিত আরামদায়ক এসব ঘর এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি, দক্ষ কারিগরের সংকট এবং আধুনিক জীবনযাপনের প্রতি মানুষের আগ্রহও এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় সৌন্দর্য ও আরামদায়ক পরিবেশের জন্য মাটির ঘরের বিশেষ পরিচিতি ছিল। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে এসব ঘরে বসবাস করতেন। গরমে শীতল ও শীতকালে উষ্ণ থাকায় মাটির ঘরকে অনেকেই প্রাকৃতিক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের সঙ্গে তুলনা করতেন। কিন্তু এখন পুরোনো মাটির ঘর ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ইটের পাকা দালান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মাটির ঘর ও ছনের ঘর নির্মাণের উপকরণ আগের মতো সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে ছনের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, দক্ষ কারিগরের অভাব এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে এসব ঘর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং দেয়ালে আর্দ্রতা জমার মতো সমস্যাও মাটির ঘরের স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলে।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর ও ছনের ঘর শুধু বসবাসের স্থান ছিল না; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামীণ মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও আবেগ। মাটির ঘরের উঠান, ছনের চালের নিচে পরিবারের একসঙ্গে বসবাস কিংবা বর্ষার দিনে ঘরের ভেতর বৃষ্টির শব্দ—এসব স্মৃতি আজও অনেক মানুষের মনে নাড়া দেয়।

বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে মাটির ঘর মানেই শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন আর সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন। আধুনিকতার প্রভাবে এসব ঘর হারিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও জীবনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

৯০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন বলেন, আগে গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই মাটির ঘর দেখা যেত। মানুষ নিজেরাই মাটি কেটে দেয়াল তৈরি করতেন এবং ছন বা খড় দিয়ে চালা দিতেন। এখন সেই দৃশ্য খুব কম দেখা যায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মাটির ঘরের কথা জানলেও এমন ঘরে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাদের নেই।

খারুয়ালী গ্রামের বাসিন্দা এমদাদুল হক মিন্টু বলেন, আধুনিক বাড়িঘর মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে। তবে মাটির ঘরের আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। এসব ঘর ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। এখন পুরোনো বাড়িগুলো ভেঙে পাকা ঘর নির্মাণ করায় আগের পরিবেশ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

তরুণ বাসিন্দা জাকির হোসেন শেখের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলেছে। নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার জন্য পাকা বাড়ি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। তবে মাটির ঘর ও ছনের ঘরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার পুরোনো জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারবে।

মাটির ঘরের ঐতিহ্য সম্পর্কে ভালুকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা খান বলেন, মাটির ঘর গ্রীষ্ম ও শীত—উভয় মৌসুমেই বেশ আরামদায়ক। বন্যা, ভূমিকম্প বা প্রবল ঝড়ের মতো দুর্যোগ না হলে এসব ঘর শতাধিক বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। অনেক সময় মাটির ঘর দোতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হতো। সাধারণত এসব ঘর খুব বড় আকারের হতো না।

তিনি বলেন, পরিবারের নারীরা নরম হাতে কাদা দিয়ে মাটির ঘরের দেয়াল লেপে সেগুলোর সৌন্দর্য বাড়াতেন। এখন আর সেই মাটির ঘর চোখে পড়ে না বললেই চলে। তবে বাপ-দাদার স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো অনেকে দু-একটি মাটির ঘর টিকিয়ে রেখেছেন।

গোলাম মোস্তফা খান আরও বলেন, বর্তমানে তাঁদের এলাকায় মাটির ঘরের জায়গা দখল করেছে ইট, সিমেন্ট, বালু ও রডের তৈরি পাকা বাড়ি। বন্যা ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির ঘরের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় মানুষ পাকা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন। মাটির ঘরের পেছনে নিয়মিত মেরামতের খরচের পরিবর্তে একবারে বেশি ব্যয় করে স্থায়ী পাকা বাড়ি নির্মাণকেই তাঁরা বেছে নিচ্ছেন। ফলে মাটির ঘরের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা খানের আশঙ্কা, হয়তো এমন দিন বেশি দূরে নয়, যখন মাটির ঘরের কথা মানুষের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যাবে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এসব ঘর রূপকথার গল্পের মতো মনে হতে পারে। তখন মাটির ঘরের পরিচয় মিলবে গল্প, কবিতা, সাহিত্য কিংবা জাদুঘরের প্রদর্শনীতে।

সচেতন মহলের মতে, উন্নয়নের ধারাকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করা জরুরি। ভালুকার গ্রামীণ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের স্মারক হিসেবে পুরোনো মাটির ঘর ও ছনের ঘরের নমুনা সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঘরের নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মাটির ঘর ও ছনের ঘর হয়তো আগের মতো আর গ্রামীণ জনপদের প্রধান আবাসস্থল হয়ে উঠবে না। তবু এসব ঘরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন অনেকের প্রত্যাশা। আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় বদলে যাচ্ছে ভালুকার গ্রামাঞ্চল। সময় থাকতে ঐতিহ্যবাহী এসব ঘর সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ বাংলার এই পরিচিত রূপ হয়তো কেবল গল্প আর ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।


Share: