Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রাজশাহী বিভাগ / সারাদেশ / বগুড়া / ফ্রেমে ইতিহাস, মাটিতে ভবিষ্যৎ—প্লাবনের পথচলা - Chief TV

ফ্রেমে ইতিহাস, মাটিতে ভবিষ্যৎ—প্লাবনের পথচলা - Chief TV

2026-09-05  ডেস্ক রিপোর্ট  36 views
ফ্রেমে ইতিহাস, মাটিতে ভবিষ্যৎ—প্লাবনের পথচলা - Chief TV

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গুলশান-বনানী লেকের পাশের পথগুলো প্রায় নিস্তব্ধ। শুক্রবারের সকালে যখন অধিকাংশ মানুষ একটু বেশি ঘুম কিংবা অবসরের সময় কাটান, তখন একজন মানুষ ছোট্ট একটি চারাগাছ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন ভেজা মাটির সামনে। মাটি খুঁড়ে চারাটি রোপণ করেন, গোড়ায় পানি দেন। কাজ শেষ করে কাঁধে তুলে নেন ক্যামেরা। কারণ কয়েক ঘণ্টা পরই হয়তো তাকে ছুটতে হবে কোনো ঘটনাস্থলে, যেখানে ঘটেছে দুর্ঘটনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা।

এই মানুষটি এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন। পেশায় ফটোসাংবাদিক হলেও ক্যামেরার পরিচয়ের বাইরেও তার রয়েছে ভিন্ন এক জগৎ। দিনের এক অংশে তিনি সংবাদচিত্রের মানুষ, অন্য অংশে স্বেচ্ছাসেবক, পরিবেশকর্মী, বৃক্ষপ্রেমী, প্রাণী রক্ষাকারী ও মানুষের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মী। ক্যামেরা তার পেশা, আর মানবিকতা যেন তার জীবনচর্চা।

 

5d542599-7024-4340-bd28-76cc0e39e9f3.jpg

 

বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়কে ফ্রেমবন্দি করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন প্লাবন। করোনা মহামারি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের রাজনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তিনি ক্যামেরায় নথিবদ্ধ করেছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে ফটোসাংবাদিক হিসেবে কর্মরত প্লাবনের তোলা ছবি দেশ-বিদেশের শতাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

চলতি বছর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী টাইমেও প্রকাশিত হয়েছে তার তোলা তারেক রহমানের একটি আলোকচিত্র। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা এবং তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দুটি ছবিও বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একজন সংবাদ আলোকচিত্রীর জন্য এ ধরনের স্বীকৃতি শুধু পেশাগত অর্জন নয়; এটি প্রমাণ করে, শক্তিশালী একটি ছবি ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।

তবে প্লাবনের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি ক্যামেরা নামিয়ে রাখেন।

২০২০ সালে করোনা মহামারিতে যখন পুরো পৃথিবী কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল, মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিল আতঙ্কে, তখন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন প্লাবন। নিজের জন্মস্থান বগুড়ার ধুনট উপজেলায় দীর্ঘ সময় মানুষের পাশে ছিলেন তিনি। করোনা আক্রান্ত রোগীদের উদ্ধারে সহায়তা, অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া, আক্রান্ত পরিবারের কাছে খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, জীবাণুনাশক স্প্রে, মাস্ক ও পিপিই বিতরণ এবং প্রশাসনকে লকডাউন বাস্তবায়নে সহযোগিতা—বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।

করোনাকালে তার স্বেচ্ছাসেবী কাজের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল মৃতদের শেষযাত্রায় পাশে দাঁড়ানো। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মরদেহ দাফনের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তির সৎকারেও অংশ নিয়েছেন তিনি। যখন সংক্রমণের আশঙ্কায় অনেক পরিবার প্রিয়জনের কাছাকাছি যেতে পারছিল না, তখন কিছু মানুষ নীরবে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। প্লাবন ছিলেন তাদেরই একজন।

 

95218904-cbca-4269-b06a-c786359ba34d.jpg

 

মহামারি শেষ হলেও থেমে যায়নি তার স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম। ধুনট উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে ‘স্বপ্নসেবা’ সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। ঈদে নতুন পোশাক ও নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য গরু-ছাগল দেওয়ার মতো উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন। ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সদস্য হিসেবেও বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি। রক্তদান কর্মসূচি, অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং বৃক্ষরোপণ তার নিয়মিত কর্মকাণ্ডের অংশ।

তবে প্লাবনের পরিচয়ের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরিবেশের বিষয়টি। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শুধু কথা বলার বদলে মাঠপর্যায়ে কাজ করতেই গড়ে তুলেছেন ‘হেল্প দ্য নেশন’ নামে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

গত এক দশক ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তালবীজ রোপণ করে আসছেন তিনি। নিজের হাতে মাটিতে পুঁতে দেওয়া সেই বীজের অনেকগুলোই এখন পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয়েছে। তালগাছের পাশাপাশি কয়েক হাজার দেশীয় ফলজ বৃক্ষও রোপণ করেছেন তিনি। দেশের যেখানেই যান, সঙ্গে থাকে গাছের চারা কিংবা বীজ। সুযোগ পেলেই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সেগুলো রোপণ করেন।

প্লাবনের কাছে বৃক্ষরোপণ নিছক শখ নয়। এটি ভবিষ্যতের সঙ্গে এক ধরনের নীরব অঙ্গীকার। তিনি মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পরিসংখ্যান ও নীতিনির্ধারণী আলোচনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মাটিতে একটি বীজ পুঁতে দেওয়ার কাজটিও অর্থবহ।

নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষ হিসেবে প্রকৃতির রুদ্ররূপ খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্লাবন। দেখেছেন নদী কীভাবে মানুষের বসতভিটা কেড়ে নেয়, আবার জলবায়ুর পরিবর্তন কীভাবে বদলে দেয় মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই চরাঞ্চল তার পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে বৃক্ষরোপণকে তিনি শুধু সবুজ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখেন না; বরং ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিকে আরও টেকসই করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন।

সম্প্রতি বিলুপ্তপ্রায় করঞ্জা গাছের পাঁচশ বীজ সংগ্রহ করেছেন প্লাবন। সেগুলো থেকে চারা উৎপাদনের কাজ চলছে। তার স্বপ্ন, দেশীয় প্রজাতির এসব গাছ আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশ নিয়ে তার কাজ শুধু বৃক্ষরোপণে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে আহত কিংবা বিপদে পড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধারের কাজেও অংশ নেন তিনি। মানুষের পাশাপাশি গাছপালা, নদী ও প্রাণীকে প্রকৃতির একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখেন তিনি।

ঢাকায় প্রতি শুক্রবার ভোরে ৫৫ কদমতলা সংগঠনের সঙ্গে গুলশান-বনানী লেক এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নেন প্লাবন। সপ্তাহের ছয় দিন সংবাদ সংগ্রহের ব্যস্ততা থাকলেও ছুটির দিনটিকেও তিনি প্রকৃতির জন্য কাজে লাগান। তার স্বপ্ন, পরবর্তী প্রজন্ম এমন একটি পৃথিবীতে বেড়ে উঠুক, যেখানে বাতাস আরও নির্মল, গাছ আরও সবুজ এবং প্রকৃতি আরও নিরাপদ।

এই ভাবনা থেকেই নিজের কন্যার মাত্র এক মাস বয়স থেকে তাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২০টি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কর্মসূচিটির নাম দিয়েছেন ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’। এটি কোনো প্রচারণা নয়; বরং একজন বাবার পক্ষ থেকে নিজের সন্তানের জন্য সবুজ ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার প্রতীকী অঙ্গীকার।

ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে গাছ লাগানোর দৃশ্যটি তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিবেশ ও মানবিক দায়িত্ববোধের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার গল্প।

সংবাদপত্রের পেশা খুব কম মানুষকেই অবসর দেয়। তবু ছুটি পেলেই প্লাবনের পথ গিয়ে মেশে তার জন্মস্থান ধুনটে। কখনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ান, কখনো সামাজিক সংগঠনের কাজে যুক্ত হন, আবার কখনো নতুন কোনো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। ধুনটে যাওয়া সম্ভব না হলে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ চালিয়ে যান।

প্লাবনের কাছে ছুটির অর্থ শুধু বিশ্রাম নয়; বরং সমাজ ও প্রকৃতির জন্য আরও কিছু করার সুযোগ।

ফটোসাংবাদিকদের নাম অনেক সময় ছবির চেয়ে ছোট হয়ে থাকে। সংবাদপত্রের পাতায় পাঠকের চোখ আগে যায় ছবির দিকে, পরে ক্যাপশনে খুঁজে পাওয়া যায় আলোকচিত্রীর নাম। কিন্তু প্লাবনের জীবন দেখলে মনে হয়, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো ছবির নিচে লেখা নাম নয়।

তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখেন, আবার প্রয়োজন হলে ক্যামেরা নামিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। আর সেখানেই একজন সফল ফটোসাংবাদিকের গল্প ছাড়িয়ে তার জীবন হয়ে ওঠে পরিবেশ সচেতন, মানবিক ও দায়িত্বশীল এক মানুষের গল্প।


Share: