Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রংপুর বিভাগ / সারাদেশ / নীলফামারী / ঝাড়ু তৈরি করে বদলাচ্ছে হতদরিদ্র মানুষের জীবন - Chief TV

ঝাড়ু তৈরি করে বদলাচ্ছে হতদরিদ্র মানুষের জীবন - Chief TV

2026-10-17  মো: জাকির হোসেন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি  50 views
ঝাড়ু তৈরি করে বদলাচ্ছে হতদরিদ্র মানুষের জীবন - Chief TV

নীলফামারীর সৈয়দপুরে ফুলঝাড়ু তৈরি করে একদিকে যেমন স্থানীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের। একজন উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র এই হস্তশিল্প কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বেকার যুবক ও অসহায় মানুষ। স্থানীয় বাজারে সাড়া ফেলার পর এবার এসব ঝাড়ু বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে সৈয়দপুর শহরের সাহেবপাড়ায় রেলওয়ে হাসপাতালসংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত রেলওয়ে কোয়ার্টারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ত সময় পার করছেন কয়েকজন শ্রমিক। কেউ ফুল গুছিয়ে বাঁধছেন, কেউ পাটকাঠি যুক্ত করছেন, আবার কেউ ঝাড়ুর হাতলে কচটেপ পেঁচিয়ে দিচ্ছেন। কয়েক ধাপের কাজ শেষে তৈরি হচ্ছে ব্যবহার উপযোগী ফুলঝাড়ু।

কারখানাটির নাম ‘আরব ট্রেডার্স অ্যান্ড কুটির শিল্প’। এর উৎপাদিত পণ্যের নাম ‘গ্রাম বাংলা ঝাড়ু’। আরএস এন্টারপ্রাইজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ফাইয়াজুল হক সাজু।

কারখানাটিতে প্রতিদিন বিভিন্ন আকার ও নকশার প্রায় ৭০০ থেকে এক হাজার ঝাড়ু তৈরি হচ্ছে। এতে কাজের সুযোগ পেয়েছেন ৭ থেকে ১০ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দরিদ্র যুবক ও ছিন্নমূল মানুষ, যাঁদের অনেকেই আগে বেকার অবস্থায় দিন কাটাতেন। এখানকার তৈরি ঝাড়ু সৈয়দপুরসহ আশপাশের এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। উদ্যোক্তার আশা, শিগগিরই এসব পণ্য বিদেশের বাজারেও পৌঁছাবে।

কারখানার প্রধান কারিগর সৈয়দপুরের বাঙালিপুর নিজপাড়া এলাকার লিটন সরকার (৫৫)। তাঁর দুই ছেলে পারভেজ (২৮) ও মনিরুল ইসলাম (১৮) ঝাড়ুর হাতলে পাটকাঠি লাগানো ও তার দিয়ে বাঁধার কাজ করেন। ছিন্নমূল নারী পুতুল (৩৮) পাটকাঠি পরিষ্কার করেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন দরিদ্র যুবক তার ও কচটেপ পেঁচিয়ে ঝাড়ু তৈরির কাজ সম্পন্ন করেন।

বাঙালিপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর পীরপাড়া এলাকার নুর ইসলামের ছেলে নুরনবী (১৫) জানান, আগে তিনি বেকার ছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। এখন এই কারখানায় কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছেন। কোনো কোনো কর্মী দৈনিক ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। নুরনবীর ভাষ্য, উদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু তাঁকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারছেন।

একইভাবে নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছেন ছিন্নমূল নারী পুতুল। তিনি জানান, আগে রাস্তায় ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। কখনো খাবার জুটত, কখনো না খেয়েই দিন কাটত। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভারী কাজ করতে পারতেন না, আবার হোটেল কিংবা বাসাবাড়িতেও কাজ পেতেন না। এখন কারখানায় তুলনামূলক সহজ কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছেন। এতে তাঁর জীবনযাপনে স্বস্তি ফিরেছে।

উদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু জানান, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানা থেকে ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে সৈয়দপুরে পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তাঁরা। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক, ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে কুমিল্লায় ঝাড়ু তৈরির কার্যক্রম দেখে ও শিখে সৈয়দপুরে এই কারখানা চালু করেছেন। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে ফুল সংগ্রহ করে স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে ঝাড়ু তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মহীন ও দরিদ্র যুবকদের কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন তিনি, যাতে তাঁরা আয় করার পাশাপাশি বিপথে যাওয়া থেকে দূরে থাকতে পারেন।

সাজুর দাবি, ঝাড়ু তৈরিতে পাটকাঠি ব্যবহারের ফলে পাটচাষিদের ফেলে দেওয়া উপকরণও কাজে লাগছে। একই সঙ্গে কম দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম থেকে ঝাড়ু এনে আকারভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করা হতো। এখন সৈয়দপুরে তৈরি ঝাড়ু ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন। ইতোমধ্যে সৈয়দপুরসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এসব ঝাড়ু বিক্রি হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে ফাইয়াজুল হক সাজু বলেন, এ ধরনের ক্ষুদ্র হস্তশিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহীদের সহযোগিতা করে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে চান তাঁরা। উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরির উদ্যোগও চলছে। তাঁর প্রত্যাশা, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে ঝাড়ু পাঠানো শুরু হবে। সারা বছর চাহিদা থাকায় এ শিল্পে সফলতার ভালো সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। একই সঙ্গে সৈয়দপুরের ব্যবসায়ী ও আগ্রহী ব্যক্তিদের এ ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।


Share: