Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / ময়মনসিংহ বিভাগ / সারাদেশ / নেত্রকোনা / একটি আঙুল তুলে মুনতাহা বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে’ - Chief TV

একটি আঙুল তুলে মুনতাহা বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে’ - Chief TV

2026-10-26  ডেস্ক রিপোর্ট  33 views
একটি আঙুল তুলে মুনতাহা বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে’ - Chief TV

বাড়ির সামনে উড়ছে দুটি বেলুন। একটি মুরগির আকৃতির, অন্যটি হাঙরের। চার বছরের মুনতাহা জামান প্রান্তি জানায়, মুরগির বেলুনটি তার, আর হাঙরেরটি ছোট ভাইয়ের। বেলুন দুটি কিনে দিয়েছিলেন বাবা। বাবা কোথায়—জানতে চাইলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে বলে, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে।’

‘স্কাই’ মানে আকাশ। মুনতাহা জানে, বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। কিন্তু বাবা যে আর কখনো ফিরে আসবেন না, তা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। বাবাকে হারানোর গভীর শোকের মাঝেও খেলনা নিয়ে মেতে আছে শিশুটি। তার ছোট্ট পৃথিবীতে এখনো বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে বেলুন আর খেলনাগুলোর সঙ্গে।

মুনতাহার বাবা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তিনি। শ্বশুরবাড়ির কাছেই গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন তিনি।

গত শুক্রবার দুপুরে আলিফের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের সামনের উঠানে খেলছে মুনতাহা। পরনে লাল গেঞ্জি ও নীল হাফপ্যান্ট। উঠানজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা রঙের খেলনা। কোথাও লাল রঙের দোলনা মোটরসাইকেল, কোথাও পুতুল, টেডি বিয়ার, প্লাস্টিকের সিংহ ও খেলনা চুলা। পাশে পড়ে আছে খোলা বই-খাতা।

কখনো খেলনা মোটরসাইকেলে চড়ে দোল খাচ্ছে মুনতাহা, কখনো পুতুল হাতে নিয়ে খেলছে। একটি পুতুলের মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। উঠানের এক পাশে গাছের ছায়া, চারদিকে টিনের ঘর। মাথার ওপর উড়ছে বাবার কিনে দেওয়া বেলুন দুটি। এই উঠানেই এখন কাটছে তার দিন।

মুনতাহা ছিল বাবার খুব আদরের। মেয়ের ছোট ছোট আবদার পূরণ করতে ভালোবাসতেন আলিফ। মুনতাহার প্রিয় খাবার চিকেন ফ্রাই। কোনো দিন ভালো করে পড়াশোনা করলে বাবার কাছে সেটি খেতে চাইত সে। বাবা বাইরে থেকে খাবারটি এনে দিতেন। মেয়ের আনন্দেই আনন্দ খুঁজে নিতেন তিনি।

সেই বাবা আর নেই। কিন্তু তাঁর কিনে দেওয়া খেলনা আর বেলুনগুলো রয়ে গেছে। সেগুলো নিয়েই এখনো মেতে থাকে মুনতাহা। তার নিষ্পাপ হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক শূন্যতা, যার অর্থ বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার।

মুনতাহার মা খাদিজা আক্তার। তিনি গারো সম্প্রদায়ের নারী। আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম রাখা হয় খাদিজা আক্তার; আগে নাম ছিল আনন্দিতা সাংমা।

screenshot-2026-10-26-171439-1.jpg

বাড়িতে অতিথি আসায় পানি, চা ও বিস্কুট এনে দেন খাদিজা। মায়ের সঙ্গে আপ্যায়নের কাজে যোগ দেয় মুনতাহাও। ছোট ছোট হাতে বিস্কুট নিয়ে বারবার অতিথিদের দিকে এগিয়ে আসে। তার এই ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই, মাত্র কয়েক দিন আগে পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে কী ভয়াবহ বিপর্যয়।

স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন খাদিজা। তখন মায়ের পাশে বসে নীরবে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মুনতাহা। একপর্যায়ে মা কেঁদে উঠলে আরও কাছে চলে আসে শিশুটি। নিজের ছোট্ট গাল মায়ের গালের সঙ্গে লাগিয়ে রাখে। মায়ের কান্নার কারণ কতটা বুঝতে পারে, তা জানা নেই। তবে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায় না সে।

মুনতাহার ছোট ভাই আয়ান ফকির সাফওয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। বাড়ির জীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে ছিল সে। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার মতো বয়স তারও হয়নি। বড় হয়ে বাবার কোলে চড়া কিংবা তাঁর আদরের স্মৃতি মনে থাকবে কি না, তা অনিশ্চিত। অথচ এই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ ঘিরেই ছিল আলিফ ও খাদিজার স্বপ্ন।

স্বামীর মৃত্যুর আগেও সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল। সাংবাদিকতা করে আলিফ যা আয় করতেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। খাদিজা নার্সিং পড়েছেন। ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টা করার কথা ছিল তাঁর। আগামী নভেম্বর থেকে সেখানে থাকার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন স্বামী-স্ত্রী।

ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে আলিফের শাশুড়ি ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন করে জীবন শুরুর আগেই গুলিতে প্রাণ হারান আলিফ। বদলে যায় পরিবারটির সব পরিকল্পনা। যে টাকা নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা, সেই ঋণের ৪০ হাজার টাকাই এখন সংসার চালানোর ভরসা।

এই টাকা শেষ হলে কীভাবে সংসার চলবে, তা জানেন না খাদিজা। দুই শিশুর খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, সেই দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়া করছে। যে মানুষটির সঙ্গে সংসার গড়েছিলেন, সন্তানদের বড় করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি আর নেই। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের দায়িত্ব এখন একাই সামলাতে হবে তাঁকে।

কিন্তু মায়ের এসব দুশ্চিন্তার কিছুই বোঝে না চার বছরের মুনতাহা। সে এখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে বলে, বাবা কিনে দিয়েছেন। বাবা কোথায়—জিজ্ঞেস করলে সহজ শিশুভাষায় জানায়, ‘স্কাই হয়ে গেছে।’

আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবাকে খুঁজে নেওয়া এই শিশুটি এখনো জানে না, তার জীবনে কত বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। বাবার কিনে দেওয়া বেলুন দুটি উড়ছে বাড়ির সামনে, আর বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করছেন তার মা।


Share: