Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / ঢাকা বিভাগ / সারাদেশ / কিশোরগঞ্জ / আধুনিক সভ্যতার বাইরে এক গ্রাম, শোনেনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম - Chief TV

আধুনিক সভ্যতার বাইরে এক গ্রাম, শোনেনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম - Chief TV

2026-09-03  ডেস্ক রিপোর্ট  41 views
আধুনিক সভ্যতার বাইরে এক গ্রাম, শোনেনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম - Chief TV

কিশোরগঞ্জের নিকলী ইউনিয়নের দুর্গম গোড়াদিঘা গ্রাম। হাওরবেষ্টিত এই জনপদে নৌকাই মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। কিছুদিন আগেও গ্রামের অনেক নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে জানতেন না। মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ও তুলা ব্যবহারের কারণে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়লেও বিষয়টিকে অনেকেই স্বাভাবিক বা ভাগ্যের বিষয় হিসেবে মেনে নিতেন।

গোড়াদিঘায় হাতে গোনা কয়েকটি ফার্মেসি রয়েছে। সেখানকার কর্মীদের অনেকেরও স্যানিটারি ন্যাপকিন ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করতে শুরু হয় বিশেষ উদ্যোগ ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’।

সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায়, ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় এবং স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে নেওয়া হয় এই কার্যক্রম। দুর্গম হাওর এলাকার নারীদের কাছে সহজে পৌঁছাতে নৌকাকেই ব্যবহার করা হয় সচেতনতার মাধ্যম হিসেবে।

এ লক্ষ্যে গোড়াদিঘায় আয়োজন করা হয় বিশেষ আনন্দ মেলার। গ্রামের নারীদের এক জায়গায় একত্র করে সেখানে নিরাপদ পিরিয়ড ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আলোচনা করা হয়। মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয় স্টেসেইফের তিনটি বিশেষ নৌকা। সেখানে নারীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি তিন মাসের বিনামূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন পান।

স্থানীয় ফার্মেসির মালিক ও কর্মীদেরও দেওয়া হয় মাসিক স্বাস্থ্য ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি ফার্মেসিতে আসা মানুষের মধ্যে সচেতনতামূলক ব্যাগ বিতরণ করা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মা-বাবাদেরও মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

হাওর এলাকার নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় বিনোদন লুডুকে কাজে লাগিয়েও চালানো হয় সচেতনতামূলক প্রচার। বিশেষ সাপ-লুডুতে বন্ধ্যাত্ব, জরায়ু ক্যানসার ও ইনফেকশনের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। খেলার পাশাপাশি বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

গোড়াদিঘার একমাত্র স্কুলেও ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি উঠান বৈঠক ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে মাসিক নিয়ে প্রচলিত সংকোচ কাটিয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়।

কার্যক্রমকে স্থায়ী রূপ দিতে গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় ‘স্টেসেইফ গার্ল’। তাদের কাছ থেকে নারীরা সহজেই বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন নিতে পারবেন। তিন মাস পর অর্ধেক দামে ন্যাপকিন পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

স্টেসেইফের হেড অব মার্কেটিং নয়ন রায় বলেন, আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো গ্রামের মেয়েরা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কেই না জানেন, তাহলে সেটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সমান সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা। তাই শুধু পণ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, নারীদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনাই তাদের লক্ষ্য। প্রতিটি মেয়ের মাসিক যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, সে লক্ষ্যেই স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, আধুনিক যুগে এসেও গোড়াদিঘার নারীদের দীর্ঘদিন ধরে মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতার মধ্যে থাকতে হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তাদের জীবনে পরিবর্তন আনার তাগিদ থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

সান কমিউনিকেশনের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদার বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেয়েরা যখন নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন গোড়াদিঘার নারীদের বাস্তবতা তাদের ভাবিয়েছে। নারীদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আন্তরিকভাবেই কাজটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কার্যক্রম শুরুর কয়েক মাস পর গোড়াদিঘায় দেখা গেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। শুধু স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হারই বাড়েনি, মাসিক নিয়ে কথা বলার সংকোচও অনেকটাই কমেছে। যে বিষয়টি নিয়ে আগে আলোচনা হতো না, এখন সেটি স্কুল, উঠান, নৌকা এমনকি খেলাধুলার মধ্যেও উঠে আসছে।

স্থানীয় শিক্ষার্থী ইসমা জানায়, আগে তারা এসব বিষয়ে তেমন কিছু জানত না। স্টেসেইফের উদ্যোগের মাধ্যমে তারা মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। আরেক শিক্ষার্থী তৃপ্তি আক্তার জানায়, শুধু সে নয়, এলাকার অনেক নারীই এখন স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে জানেন এবং ব্যবহার করছেন।

শিক্ষার্থী কাজেফা আক্তার বলেন, আগে মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন তারা। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়ায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, আগে এই এলাকার নারীদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি ছিল। ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও ন্যাপকিন সহজলভ্য করার উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেনও জানান, একসময় এলাকার অধিকাংশ নারী মাসিক ও স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে খুব কম জানতেন। বর্তমানে অধিকাংশ নারীই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন এবং ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গোড়াদিঘার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে। অভিভাবকরাও এ বিষয়ে সচেতন হয়েছেন এবং অনেক বাবা-মা নিজেরাই মেয়েদের জন্য ন্যাপকিন কিনে দিচ্ছেন।

দুর্গম হাওর এলাকার নারীদের মধ্যে নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হওয়া এই সচেতনতা এখন গোড়াদিঘার সীমানা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কারণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পিরিয়ড নিশ্চিত করা প্রতিটি নারীর অধিকার।


Share: