Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / ঢাকা বিভাগ / সারাদেশ / ঢাকা / বার থেকে বস্তি, তারপর তুরাগে শেষ পরিণতি - Chief TV

বার থেকে বস্তি, তারপর তুরাগে শেষ পরিণতি - Chief TV

2026-11-02  ডেস্ক রিপোর্ট  45 views
বার থেকে বস্তি, তারপর তুরাগে শেষ পরিণতি - Chief TV

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁ ও বারে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং জেরিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। পরে রাতের শেষভাগে তাঁরা যান টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায়। সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত তুরাগ নদে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ।

সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ফরেনসিক পরীক্ষার নমুনা বিশ্লেষণ করে ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। তবে তাহসিফ কেন বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন, সেখানে কারা তাঁদের ধাওয়া করেছিল এবং নদে পড়ার পর তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্তোরাঁ ও বারে প্রবেশ করেন তাহসিফ, দীপ ও দিশা। মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় ঢুকতে দেখা যায়।

রেস্তোরাঁর আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দিশাকে লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁদের রেস্তোরাঁ থেকে বের হতে দেখা যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ওই রাতে তাহসিফ ১৬ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত ‘আল্ট্রা স্ট্রং’ চারটি বিয়ার পান করেছিলেন। তবে এতটা পান করার পরও তাঁর মধ্যে দৃশ্যমান নেশার লক্ষণ ছিল না। সেদিন তাঁর মন ভালো ছিল না এবং তিনি রেস্তোরাঁয় বিষণ্ন সুরের গান বাজানোর অনুরোধ করেছিলেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। দিশার সঙ্গে অন্য এক তরুণের সময় কাটানো নিয়ে তাঁর মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।

একটি সূত্রের দাবি, তাহসিফ ও দিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। কোনো একটি বিষয় নিয়ে সেদিন তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ দিশাকে বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’ তবে কী ঘটনার পর তাঁদের মধ্যে এমন কথোপকথন হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নেস্ট রেস্তোরাঁ ও বারের মহাব্যবস্থাপক এবং সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব জানান, তাহসিফ শেষবার রেস্তোরাঁয় যাওয়ার দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তাহসিফ একই তরুণীকে নিয়ে সেখানে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দীপ এবং দীপের সঙ্গে আরেক তরুণীও ছিলেন।

হাসান হাবিবের ভাষ্য, তাঁরা সেখানে গান শুনেছেন, নাচ করেছেন এবং সময় কাটিয়েছেন। আগের একদিন তাহসিফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও কথা হয়েছিল। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে গোপনে কাজ করছেন বলে জানিয়েছিলেন।

রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তাঁরা মাজার রোড দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলকে একসঙ্গে বস্তিতে ঢুকতে দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে ছিলেন তাহসিফ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তুরাগ নদসংলগ্ন ওই এলাকায় যাওয়ার পেছনে মাদক গ্রহণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে এবং ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের তথ্যও তদন্তে এসেছে। তবে তাহসিফ সেখানে গিয়ে কোনো মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর আগে তিনি অ্যালকোহল বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় অবস্থানের সময় তাহসিফ উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে মাদকসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তিনি নিজে একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে ছিলেন। পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাহসিফের সঙ্গে সেখানে আসার কথা জানান।

দীপের দাবি, পুলিশ সদস্যরা তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেতে তাঁর বেশ সময় লাগে। পরে মূল সড়কে উঠে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যান।

তবে দীপের বক্তব্যের কয়েকটি দিক নিয়ে তদন্তকারীদের প্রশ্ন রয়েছে। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিলে তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে দীপ কেন সেখান থেকে চলে গেলেন, কারা তাঁদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে ধাওয়া করা হয়েছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধাওয়া করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাহসিফ বা দীপের আগে কোনো পরিচয় কিংবা বিরোধ ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

নৌ পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার শুরুতে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যের কিছু পরিবর্তন পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁর বক্তব্য সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই রাতে বস্তি এলাকায় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে তাহসিফের সঙ্গে বারে যাওয়া জেরিকা তাসনিম দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, বারে যাওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, রেস্তোরাঁয় বসে কী আলোচনা হয় এবং বের হওয়ার পর তাঁদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না।

দিশার বক্তব্যের সঙ্গে আগে রিমান্ডে থাকা দীপের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বক্তব্যে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা তদন্তে নতুন সূত্র দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি রক্ত ও ভিসেরার নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন এবং তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।

নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

তাহসিফের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহে এখন তিনটি স্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—উত্তরার নেস্ট রেস্তোরাঁ ও বার, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এবং তুরাগ নদ। প্রথম স্থানে ছিলেন তাহসিফ, দীপ ও দিশা। দ্বিতীয় স্থানে যাওয়ার কারণ এবং সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। আর তৃতীয় স্থান তুরাগ নদ থেকেই উদ্ধার করা হয় তাহসিফের মরদেহ।

বার থেকে বের হওয়ার পর নদে পড়ার আগপর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল, সেটিই এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন। রেস্তোরাঁর ঘটনাপ্রবাহ, বস্তিতে যাওয়ার কারণ, সেখানে ধাওয়া, পুলিশের উপস্থিতি, দীপের বক্তব্য এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল—সবকিছু মিলিয়ে ওই রাতের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।


Share: