মাটির দেয়াল আর টিনের চালের ছোট্ট ঘরটিতে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। স্বামী হত্যার চার মাসের মাথায় তিন সন্তানের মা ফাতেমা বেগম নিজেই এখন কারাগারে। ভাঙচুর ও লুটপাটের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দেড় বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে কারাগারে আছেন তিনি। অন্যদিকে তার দুই সন্তান এতিমখানায় থেকে মায়ের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
ঘটনাটি কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়া গ্রামের। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কবির বাজার থেকে তাড়া করে বাড়িতে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মোহাম্মদ কাশেমকে। এ ঘটনায় রাসেলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। স্বামী হারানোর পর তিন সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম।
এর এক মাস পর ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন হত্যা মামলার অভিযুক্ত রাসেলের মা নুর জাহান বেগম। ওই মামলায় নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ সাতজনকে আসামি করা হয়।
আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত করে মহেশখালী থানা পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. মোজাহেরুল ইসলাম আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানান। পরে ৩১ অক্টোবর রাতে ফাতেমাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে আদালতে হাজির করা হলে দুজন জামিন পেলেও ফাতেমা বেগমকে তার দেড় বছরের শিশুসন্তানসহ কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। প্রতিবেদনে যাদের সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন দাবি করেছেন তারা এ মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগম নামের তিন সাক্ষীর ভাষ্য, ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো বক্তব্য দেননি এবং সাক্ষীর তালিকায় তাদের নাম কীভাবে এসেছে তাও জানেন না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও দাবি করেছেন, মামলায় উল্লেখ করা ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের বক্তব্য, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার দিন উত্তেজিত জনতার হাতে এবং সেখানে কাশেমের পরিবারের সদস্যদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তাদের বাইরে অন্য কারও বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
এদিকে ফাতেমার শাশুড়ি রাশেদা বেগমের অভিযোগ, ছেলেকে হত্যার পর তাদের পরিবারকে আরও চাপে ফেলতেই পাল্টা মামলা করা হয়েছে। কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হকও দাবি করেন, ২৪ মে এলাকায় কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল জানান, কাশেম হত্যার দিন উত্তেজিত লোকজনের হাতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। পরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নিহতের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে।
ফাতেমার স্বামী হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকলেও পাল্টা মামলায় তার কারাবন্দি হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তিন শিশুর জীবনে। দুই শিশু এখন এতিমখানায় থেকে মায়ের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে, আর দেড় বছরের শিশুটি কারাগারেই মায়ের সঙ্গে রয়েছে।