বাগেরহাটের রামপালে মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের প্রভাবে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। অপরিকল্পিত খনন, নদীর স্রোত ও বড় নৌযানের ঢেউয়ে গত কয়েক বছরে শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ভাঙনের কারণে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক, গাছপালা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে জনপদটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
রামপালের নদীতীরবর্তী রোমজাইপুর, সিংগড়বুনিয়া, ওড়াবুনিয়া ও হুড়কা ইউনিয়নের গোলারডাঙ্গি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার পাকা সড়কসহ বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীভাঙনের কবলে পড়েছে রামপাল উপজেলা কৃষি অফিস, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এবং এলজিইডির প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬২০ মিটার দীর্ঘ একটি বক্স কালভার্টও। এতে স্থানীয় হাজারো মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
জোয়ারের পানির চাপ ও সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীভাঙন তাদের শুধু বসতভিটা নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রোমজাইপুর এলাকায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার এবং ওড়াবুনিয়া এলাকায় আরও প্রায় ৪০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কেউ সরকারি রাস্তার পাশে, আবার কেউ অন্যের আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঝুঁকিতে থাকা আরও দেড় শতাধিক পরিবার প্রতিনিয়ত ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে চ্যানেল খননের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে, যার প্রভাবেই ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে ত্রাণ বা ঢেউটিন দেওয়া হলেও তা স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা জিও ব্যাগ বা দায়সারা পাইলিংয়ের পরিবর্তে নদীর বাঁক পুনর্বিন্যাস, পরিকল্পিত ড্রেজিং ও বিজ্ঞানসম্মত নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, নদীর স্বাভাবিক স্রোত ও জোয়ার-ভাটার পাশাপাশি চ্যানেলে চলাচলকারী বড় নৌযানের ঢেউও ভাঙন বাড়িয়ে দিচ্ছে। রামপাল উপজেলা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ও মোংলা-ঘাষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির অভিযোগ, ডিপিপির নকশা অনুযায়ী ৮৩টি খাল ও নদী খনন না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ নিয়ে পরিবেশ ও নদীবিজ্ঞান গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএসের তৎকালীন প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি পয়েন্টে ভাঙন রোধে কাজ চলছে। পাশাপাশি বড় ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে টেকসই প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম দ্রুত পাইলিং বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, অপরিকল্পিত ড্রেজিং বন্ধ এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া শুধু পাইলিং করে এই ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। তাদের দাবি, দ্রুত ৩৪/২ নম্বর ফোল্ডার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ বাস্তবায়নসহ নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে রামপালের আরও বহু গ্রাম ও জনপদ ভবিষ্যতে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।