মস্তিষ্কে টিউমার, একাধিক অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও লাইফ সাপোর্ট—জীবনের কঠিন এক অধ্যায় পার করেছেন ছোট পর্দার অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টি। ভারতের চেন্নাইয়ের চিকিৎসকেরা একপর্যায়ে তাঁর আয়ু আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন। এমন পূর্বাভাসে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও হাল ছাড়েননি তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও অনিশ্চয়তার সময় পেরিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এই অভিনেত্রী। প্রায় ১০ মাসের বিরতি শেষে সম্প্রতি আবার শুটিংয়ে ফিরেছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অসুস্থতা, চিকিৎসার অভিজ্ঞতা ও কাজে ফেরার অনুভূতি জানিয়েছেন তানিয়া। তাঁর ভাষ্য, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো আছেন। দীর্ঘ ১০ মাস পর আবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া, হালকা ব্যায়াম ও হাসিখুশি সময় কাটাতে পারছেন। নতুন করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোকে দ্বিতীয় জীবনের মতো মনে হচ্ছে তাঁর।
অস্ত্রোপচারের পর নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে হয়েছে তানিয়াকে। মাথার ডান পাশের সমস্যার কারণে বাঁ দিকে কাত হয়েও ঘুমাতে পারতেন না। প্রচণ্ড দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও নিয়মিত বমির সমস্যাও ছিল। রেডিওথেরাপির কঠিন সময় পার করে এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর ইকসান রনির পরিচালনায় ‘অংশীদার’ নাটকের মাধ্যমে শুটিংয়ে ফিরেছেন তানিয়া। এতে ‘সুমি’ চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি। পারিবারিক সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের টানাপড়েন নিয়ে নাটকটির গল্প। বাবার মৃত্যুর পর চাচার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে তাঁর অভিনীত চরিত্রটি।
দীর্ঘদিন শুটিং থেকে দূরে থাকায় কাজের পরিবেশকে খুব মিস করছিলেন তানিয়া। সহকর্মীদের নিজের পরিবারের মতো মনে করেন তিনি। তাই শুটিংয়ে ফেরা তাঁর কাছে শুধু পেশাগত প্রত্যাবর্তন নয়, মানসিক স্বস্তিরও বিষয়। প্রথম দিনের শুটিংয়ে পরিচালক, চিত্রগ্রাহক ও প্রযোজনা দলের সদস্যরা তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে বিশেষ যত্ন নিয়েছেন।
তবে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। চিকিৎসকেরা প্রথমে তাঁকে শুটিংয়ের অনুমতি দিতে চাননি। কারণ, এখনো তাঁর কেমোথেরাপি চলছে। কাজের চাপ থেকে শারীরিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘরে থাকতে থাকতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন তানিয়া। শেষ পর্যন্ত অনুরোধ করে একটি নাটকে কাজ করার অনুমতি নেন। এখনো তাঁর দুই মাসের কেমোথেরাপি বাকি। চিকিৎসা শেষ হলে এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন চিকিৎসকেরা।
তানিয়ার অসুস্থতার শুরু গত বছরের ডিসেম্বরে। একটি নাটকের শুটিং চলাকালে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয় তাঁর। টানা চার দিন অসুস্থতা নিয়েই কাজ চালিয়ে যান। পঞ্চম দিনে প্রচণ্ড বমি শুরু হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরদিনই মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত হয়।
শুরুতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠার আশা থাকলেও পরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। ভারতের চেন্নাইয়ের এমজিএম হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে এক ক্যানসার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে আয়ু নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস শুনতে হয় তাঁকে। চিকিৎসক জানান, তাঁর আয়ু হয়তো আর সাড়ে চার থেকে পাঁচ বছর। এ কথা শোনার পর মানসিকভাবে বড় ধাক্কা খান অভিনেত্রী।
প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে ঢাকায় থাকতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তানিয়া। পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তায়ও বিদায়ের সুর ছিল বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের সময় শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে হয়। জ্ঞান ফেরার পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পরিবেশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে পাশে মা ও বোনকে দেখে কিছুটা সাহস পান।
অসুস্থতার পুরো সময়ে মায়ের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তানিয়া। বাবা না থাকায় রাত জেগে মেয়ের সেবা করেছেন তাঁর মা। পরিবারের সদস্যদের প্রার্থনা ও ভালোবাসা তাঁকে কঠিন সময় পার করার শক্তি জুগিয়েছে। এ ছাড়া সহকর্মী মোশাররফ করিম, নিলয় আলমগীর ও প্রযোজক আলী বশীরসহ নাট্যাঙ্গনের অনেকেই নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন।
অসুস্থতার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর মৃত্যুর গুজবও। তবে সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এখন নতুন করে জীবন ও কাজের স্বপ্ন দেখছেন তানিয়া। ২০১২ সালে ভালোবাসা থেকেই অভিনয়জগতে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। এবারও সেই ভালোবাসা ও আগের উদ্দীপনা নিয়ে ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে চান।
জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তানিয়ার পরামর্শ, রোগের নাম শুনেই মনোবল হারানো উচিত নয়। মানসিক দৃঢ়তা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সময় কাটানো জরুরি। কঠিন সময়েও আশা না হারিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।