Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / আন্তর্জাতিক / ভারতে এবার জেন-জির পর আন্দোলনে জেন আলফা - Chief TV

ভারতে এবার জেন-জির পর আন্দোলনে জেন আলফা - Chief TV

2026-09-05  ডেস্ক রিপোর্ট  11 views
ভারতে এবার জেন-জির পর আন্দোলনে জেন আলফা - Chief TV

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধার দাবিতে বিক্ষোভে নামছে শিশুরা। বিশেষ করে গ্রামীণ সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে এমন প্রতিবাদের ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ১০ বছর বা তার কম বয়সী শিক্ষার্থীরাও ক্লাস বর্জন করে নিজেদের দাবিতে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি চাইছে।

উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাতপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থী নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মধ্যে আট বছর বয়সী প্রিয়াও ছিল। প্রতিবাদের সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী হাতে জাতীয় পতাকা তুলে নেয়।

বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবন দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে একটি দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পর ভবনের একটি অংশ এখনো ধ্বংসাবশেষে পড়ে রয়েছে। এরপর থেকেই নিরাপদ ভবনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সরব ছিল। গত ২২ আগস্টের বিক্ষোভের পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

পরে ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক অবস্থি বিদ্যালয়ে গিয়ে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দেন। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেদিন বাড়ি ফিরে যায়। প্রিয়া জানায়, জরাজীর্ণ ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় তারা সবসময় আতঙ্কে থাকত। সেই ভয় থেকেই সবাই মিলে প্রতিবাদে নামার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

তবে উত্তর প্রদেশের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যে স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবাদের বড় অংশই ঘটছে গ্রামীণ সরকারি বিদ্যালয়ে, যেখানে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের সর্বোদয় ইন্টার কলেজের শিক্ষার্থীরা গত ২৮ জুলাই পর্যাপ্ত খাবার পানি, বিদ্যুৎ ও বেঞ্চের দাবিতে বিক্ষোভে নামে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রেণিকক্ষে ফ্যান চলে না। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হয়।

মহারাষ্ট্রের পারলির বৈদ্যনাথ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ৩১ জুলাই শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদ করে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।

বিহারের সিমুয়ারা গ্রামে প্রায় ৫০ শিক্ষার্থী নিম্নমানের মধ্যাহ্নভোজের অভিযোগে প্রতিবাদ করে। তারা খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে। শিক্ষার্থীদের দাবি, স্কুলে পাইপলাইনের পানি না থাকায় রান্নার আগে খাবারের উপকরণও যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয় না।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করে। দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয়, রাজ্য বা স্থানীয় সরকারের অধীনে। সরকারি প্রতিবেদনে ভর্তি বাড়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের উন্নতি এবং ঝরে পড়ার হার কমার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র নিয়ে ভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা অধিকারকর্মীদের মতে, ভারতের অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিরাপদ ভবন, বেঞ্চ, বিদ্যুৎ, পানি ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা নেই। কোথাও কোথাও এমন ভবনেও ক্লাস হয়, যা একই সঙ্গে গবাদিপশু রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় এক লাখ ৮৪৩টি স্কুলে সব শ্রেণির জন্য মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ২৯ লাখ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত। অন্যদিকে, প্রায় পাঁচ হাজার ৬৬৩টি স্কুলে কোনো শিক্ষার্থীই নিবন্ধিত নেই।

শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে দেশটির বৃহত্তর তরুণ আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতার বিরুদ্ধে তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। এ ধারাবাহিকতায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনও স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে সরব হয়েছে। সংগঠনটি ১৫ আগস্ট ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে কর্মসূচি শুরু করে।

ভারতের ২০০৯ সালের শিক্ষা অধিকার আইন অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষা মৌলিক অধিকার। আইনে নিরাপদ ও টেকসই স্কুল ভবন, বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং শিশুদের নিরাপত্তার মতো মৌলিক অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বাস্তব পরিস্থিতি এখনো সেই মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিশুদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ফলে বর্তমানে স্কুলে নিজেদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ করা শিশুদের একটি বড় অংশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভোটার হবে। শিক্ষা অধিকারকর্মীদের মতে, নিরাপদ পরিবেশ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা ভবিষ্যতে শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নয়, দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।


Share: