Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রাজশাহী বিভাগ / সারাদেশ / সিরাজগঞ্জ / চরে ‘ফাটাকেষ্ট’ ইউএনওর বিদায়, কর্মে রেখে গেলেন দৃষ্টান্ত - Chief TV

চরে ‘ফাটাকেষ্ট’ ইউএনওর বিদায়, কর্মে রেখে গেলেন দৃষ্টান্ত - Chief TV

2026-08-29  এস এম শুভ সরকার, কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি  73 views
চরে ‘ফাটাকেষ্ট’ ইউএনওর বিদায়, কর্মে রেখে গেলেন দৃষ্টান্ত - Chief TV

কথা কম, কাজ বেশি—এমন কর্মমুখী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেই কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা থেকে মাদকবিরোধী অভিযান, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ক্রীড়াচর্চা, উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং অসহায় মানুষের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠে কাজ করেছেন এই কর্মকর্তা।
 
দুর্গম চরাঞ্চলসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে সরব উপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত মুখ। সম্প্রতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে অন্য জেলায় বদলি হওয়ায় তার বিদায়ে আবেগ ও আক্ষেপ দেখা দিয়েছে কাজিপুরবাসীর মধ্যে। স্থানীয়দের অনেকেই তাকে ডাকেন ‘ফাটাকেষ্ট’ ইউএনও নামে।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চৌহালী উপজেলা থেকে কাজিপুরে যোগ দেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পান। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার কঠোরতা, নিরপেক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতার কারণে কাজিপুরে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন হয়। অনেকের মতে, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এমন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন খুব কমই দেখেছে কাজিপুরবাসী।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এই ইউএনও। বিভিন্ন অভিযানের পাশাপাশি একটি শিক্ষকের বাড়ি থেকে গাঁজার গাছ উদ্ধারের ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শিক্ষার্থীদের মাদক, বাল্যবিবাহ ও ইভটিজিং থেকে দূরে রাখতে তিনি শিক্ষা ও ক্রীড়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এডিপির অর্থায়নে উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া সামগ্রী, শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, কলম, পেন্সিল, পানির ফ্লাস্কসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়।

মহান বিজয় দিবস আয়োজনেও ছিল তার ব্যতিক্রমী চিন্তার ছাপ। অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে মুক্তিযোদ্ধা, গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছাত্র প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আলাদা ট্যাগ ও আসনের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে মানসম্মত উপহার দেওয়ার উদ্যোগও প্রশংসিত হয়।

কাজিপুরে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নকলমুক্ত রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় উপজেলা প্রশাসন। একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের সব কক্ষের পরিদর্শক পাশের জেলা থেকে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এতে পরীক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান প্রশংসা কুড়ায়।

উন্নয়নকাজের মান নিশ্চিত করতেও আপস করেননি তিনি। কাজিপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টি দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। এসব এলাকায় উন্নয়নকাজের গুণগত মান বজায় রাখা সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্ব পালনকালে তিনি একাধিকবার সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন। ঠিকাদারদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট করে দেন, কাজের ত্রুটি সংশোধন ও গুণগত মান নিশ্চিত না হলে বিল পরিশোধ করা হবে না। স্থানীয়দের দাবি, তার কঠোর নজরদারির ফলে বিশেষ করে চরাঞ্চলের উন্নয়নকাজে আগের তুলনায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন ও নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ শিকারের বিরুদ্ধেও ছিলেন সক্রিয়। দিনের দাপ্তরিক কাজ শেষে রাতের আঁধারে নৌ-পুলিশ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে যমুনা নদীতে অভিযান চালানোর ঘটনাও রয়েছে। অনেক সময় রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জাল এবং বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন তিনি। দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি চাল অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগেও ঝুঁকি নিয়ে অভিযান চালিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এসব কঠোর পদক্ষেপ নিতে গিয়ে তিনি অনেকের বিরাগভাজন হলেও দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও রেখে গেছেন নিজের ছাপ। দায়িত্বের শেষ দিকে একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি।

স্থানীয়দের মতে, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুধু দাপ্তরিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। কাজিপুরে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষা, ক্রীড়া, আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ ও উন্নয়ন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে সেই দৃষ্টান্তই রেখে গেছেন এই কর্মকর্তা।

বিদায়ের মুহূর্তে তাই কাজিপুরবাসীর আলোচনায় বারবার উঠে আসছে তার কর্মমুখী ভূমিকার কথা। কথা কম বলে মাঠে বেশি কাজ করার কারণে স্থানীয়দের দেওয়া ‘ফাটাকেষ্ট ইউএনও’ পরিচয়টি এখন তার দায়িত্ব পালনের একটি ব্যতিক্রমী স্মৃতি হয়ে থাকছে।

Share: