বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের কাছে পরিচিত এক কণ্ঠের নাম শায়খ ড. ইয়াসির বিন রাশেদ আদ-দাওসারি। পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিবদের একজন তিনি। তাঁর সুমধুর কুরআন তেলাওয়াত মুগ্ধ করে মুসল্লিদের, আবেগাপ্লুত করে শ্রোতাদের। অথচ এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানোর পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। শৈশবে নিজের স্বপ্নের কথা বলায় শুনতে হয়েছে উপহাস, সহ্য করতে হয়েছে অবহেলা ও নিরুৎসাহ। তবে অধ্যবসায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং পবিত্র কুরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য উচ্চতায়।
১৯৮০ সালের ৬ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আল-খারজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন ইয়াসির আদ-দাওসারি। ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই আলেমের শৈশব থেকেই পবিত্র কুরআনের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। ছোটবেলায় নিয়মিত কুরআন মুখস্থের শিক্ষার আসরে অংশ নিতেন তিনি। তাঁর এক ভাইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, শৈশবে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই সাধারণ একজন ছাত্র ছিলেন ইয়াসির। তবে মনে লালন করতেন বড় এক স্বপ্ন।
কোনো দক্ষ ইমামকে নামাজ পড়াতে দেখলেই বন্ধুদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করতেন। বলতেন, তিনিও একদিন ইমাম হতে চান, যেন মানুষ তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করেন। কিন্তু তাঁর এই স্বপ্ন শুনে বন্ধুরা হাসাহাসি করত। কেউ কেউ তাঁর কণ্ঠ নিয়েও উপহাস করত এবং এমন স্বপ্ন দেখার যোগ্যতা তাঁর নেই বলে মন্তব্য করত। তবে এসব তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাঁকে লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি।
পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার পরও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ার সময় নির্দিষ্ট একজন শিক্ষকের কাছে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে এক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাঁকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেন। তাঁর সামর্থ্যকে সাধারণ মানের বলে মন্তব্য করে জীবনে অসাধারণ কিছু করার যোগ্যতা নেই বলেও জানান। কথাগুলো ইয়াসিরের মনে গভীর আঘাত হানে। হতাশায় তিনি প্রায় এক সপ্তাহ ঘরেই কাটান বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের নেতিবাচক মন্তব্য তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে না।
এরপর একদিন এশার নামাজে ইমামতি করেন ইয়াসির। সেদিন তাঁর তিলাওয়াত উপস্থিত মুসল্লিদের মুগ্ধ করে। নামাজ শেষে এক সহপাঠী তাঁর কাছে জানতে চান, সেদিনের তিলাওয়াতে বিশেষ কী করেছিলেন তিনি। জবাবে ইয়াসির জানান, মসজিদুল হারামের প্রখ্যাত ইমাম শায়খ মুহাম্মদ আইয়ুবের তিলাওয়াতের ধরন অনুসরণ করে সূরা ফাতিহা পড়ার অনুশীলন শুরু করেছিলেন। সেই অনুশীলনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র তিলাওয়াতের ধরন গড়ে তোলেন তিনি।
সহপাঠী তাঁর প্রতিভা বুঝতে পেরে বিশিষ্ট আলেম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি বড় অনুষ্ঠানে তিলাওয়াতের আমন্ত্রণ পাওয়ার পরামর্শ দেন। ইয়াসিরও তাতে সম্মত হন। অনুষ্ঠানে তাঁর তিলাওয়াত উপস্থিত অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কণ্ঠ ও তেলাওয়াতের ধরনে বিশেষত্ব খুঁজে পান শ্রোতারা।
শিক্ষাজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাঁকে। প্রথমে একটি সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে প্রায় এক বছর পড়াশোনা করেন ইয়াসির। তবে তাঁর আগ্রহ ছিল ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও কুরআনের খেদমতে। শেষ পর্যন্ত সামরিক শিক্ষার পথ ছেড়ে শরিয়াহ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
এ সিদ্ধান্তের আগে এক শিক্ষকের পরামর্শ চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও উৎসাহের পরিবর্তে সমালোচনার মুখে পড়েন। তাঁর সিদ্ধান্তকে ভুল আখ্যা দিয়ে যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ওই শিক্ষক। তবে এবারও দমে যাননি ইয়াসির। সব বাধা পেরিয়ে শরিয়াহ বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন আলেম, ইমাম ও খতিব হিসেবে।
মসজিদুল হারামের ইমাম হওয়ার আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন মসজিদে দীর্ঘদিন ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর মধ্যে রিয়াদের মসজিদুদ দাখিল উল্লেখযোগ্য। ওই মসজিদে তাঁর তিলাওয়াতের রেকর্ডিং ক্যাসেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠের সুর ও স্বতন্ত্র তিলাওয়াতের ধরন তাঁকে ধীরে ধীরে কুরআনপ্রেমীদের কাছে পরিচিত করে তোলে।
শৈশবে যে তরুণের ইমাম হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বন্ধুরা হাসাহাসি করত, একসময় তাঁর তিলাওয়াতই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। উপহাস ও হতাশার দিন পেরিয়ে শায়খ ইয়াসির আদ-দাওসারি হয়ে ওঠেন খ্যাতিমান আলেম, খতিব ও কুরআন তেলাওয়াতকারী। বর্তমানে পবিত্র মসজিদুল হারামের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাঁর জীবনকাহিনি স্বপ্নের প্রতি নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।