তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের অন্তত ১০ সদস্য আহত হয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সকাল ৯টার পর বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। নরসিংহপুর, জিরাবো, কাঠগড়া, ঘোষবাগ ও উলাইলসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভের কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে নিউএইজ গ্রুপের শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পরে আশপাশের কারখানার সামনে গিয়ে অন্য শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করলে দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশের অন্তত ১০ সদস্য আহত হন। পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্ষোভকারী জানান, নিউএইজ, অনন্ত, শারমীন ও আল-মুসলিম কারখানার শ্রমিকেরা হা-মীমের শ্রমিকদের বাইরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেখানে প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁদের ওপর আক্রমণ করা হয় এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জিরাবো থেকে কাঠগড়াগামী সড়কের পাশে বেঙ্গল প্লাস্টিক পাইপস লিমিটেডের সামনে চার থেকে পাঁচ শ শ্রমিক বিক্ষোভ করেন। এ সময় কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং শ্রমিকদের বাইরে আসার আহ্বান জানান তাঁরা। পরে আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
জিরাবো এলাকার মিনি সাউদার্ন গার্মেন্টসের এক শ্রমিক জানান, আন্দোলনকারীরা কারখানার সামনে আসার পর তাঁদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। কাঠগড়া পুকুরপাড় পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কারখানাও বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
সকাল ১০টার দিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের ঘোষবাগ এলাকায় বিভিন্ন কারখানার সামনে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে গেলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা সড়কে বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন। পরে পুলিশ ধাওয়া ও লাঠিচার্জ করে তাঁদের সরিয়ে দেয়।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। দুপুর ১টার দিকে একই এলাকায় আবারও দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে দুজনকে আটক করে পুলিশ।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, শ্রমিকেরা তাঁদের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পোশাক কারখানায় ভাঙচুর এবং পোশাক খাতের বাইরের পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাগুলো সন্দেহজনক বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সাধারণ শ্রমিকেরা নিজেদের কারখানা ভাঙচুর করেন না। এসব ঘটনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। আশপাশের যেসব কারখানায় কাজ চলছিল, সেখান থেকেও শ্রমিকদের বের করে আনা হয়।
তিনি জানান, নরসিংহপুর এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া, আগুন জ্বালানো এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ ও ঢাকা জেলা পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং কারখানায় ভাঙচুর ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, নরসিংহপুর, বিশমাইল ও কাঠগড়া এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনে বহিরাগত ব্যক্তিরা যুক্ত হয়েছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁদের শনাক্ত করে আটকের চেষ্টা চলছে।
সোমবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিম গ্রুপের কারখানার সামনে যান ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন এবং সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম।
সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং বোর্ডের কার্যক্রম চলছে। শ্রমিকদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান।
ডিআইজি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং হবে।
এদিকে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। তাঁর দাবি, সোমবার কোনো পোশাক কারখানায় হামলার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে।
ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিরা শ্রমিক নন বলে দাবি করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। হেলমেট বা মাস্ক পরে যারা ভাঙচুর করছে, তাদের বিষয়েও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে শামীমা পারভীন বলেন, কারখানায় কাজে যেতে কেউ বাধা দিলে পুলিশকে জানাতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের।