Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / লাইফস্টাইল / ভূতকে কেন সাদা কাপড়ে দেখানো হয়, জানুন পেছনের ইতিহাস - Chief TV

ভূতকে কেন সাদা কাপড়ে দেখানো হয়, জানুন পেছনের ইতিহাস - Chief TV

2026-10-24  ডেস্ক রিপোর্ট  33 views
ভূতকে কেন সাদা কাপড়ে দেখানো হয়, জানুন পেছনের ইতিহাস - Chief TV

ভূতের কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সাদা কাপড়ে ঢাকা এক রহস্যময় অবয়ব। কখনো চোখের জায়গায় দুটি ছিদ্র, কখনো লম্বা সাদা কাপড়ে ঢাকা ভাসমান ছায়া। সিনেমা, কার্টুন, গল্প কিংবা হ্যালোইনের সাজসজ্জায় ভূতের এমন চেহারা বহুদিন ধরেই পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানো হয় কেন? কালো বা অন্য কোনো রঙের পোশাক নয় কেন? এর পেছনে রয়েছে প্রাচীন সমাধি প্রথা, লোককথা, মানুষের নানা বিশ্বাস এবং নাটক-সিনেমার দীর্ঘ প্রভাব।

ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানোর একটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো প্রাচীন সমাধি প্রথা। কয়েক শতাব্দী আগে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃতদেহ কফিনে রাখার পরিবর্তে কাপড়ে মুড়িয়ে সমাহিত করা হতো। এ কাপড়কে বলা হতো কাফন। মৃতদেহ মোড়াতে সাদা লিনেন কাপড় ব্যবহার করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে আলাদা কাফন কেনার সামর্থ্য না থাকলে মৃত ব্যক্তির বিছানার চাদর দিয়েও দেহ মোড়ানো হতো।

তৎকালীন মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, মৃত ব্যক্তির আত্মা কখনো কখনো জীবিতদের জগতে ফিরে আসতে পারে। সেই বিশ্বাস ও কল্পনা থেকে মৃতদের কাফনে মোড়ানো অবয়ব হিসেবে দেখানোর ধারণা গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে লোককথা ও শিল্পের মাধ্যমে পরিচিতি পায় সাদা কাপড়ের ভূত।

ইউরোপের মধ্যযুগে ভূত নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন গল্পে মৃতদের কঙ্কাল কিংবা কাফনে মোড়ানো অবয়ব হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এর একটি উদাহরণ ‘দ্য থ্রি লিভিং অ্যান্ড দ্য থ্রি ডেড’ নামের মধ্যযুগীয় কাহিনি। এতে তিনজন জীবিত মানুষের সামনে তিনটি মৃত অবয়বের আবির্ভাব ঘটে। তারা জীবিতদের মৃত্যু ও মানুষের নশ্বরতা সম্পর্কে সতর্ক করে।

১৩০০-এর দশকের কিছু চিত্রকর্মেও কাফনে মোড়ানো মৃতদেহের ছবি দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ভূতের গল্প এবং কথিত অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সাদা কাফনের উপস্থিতি আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।

সাদা কাপড়ে ঢাকা ভূতের ধারণা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বাস্তব জীবনের কিছু ঘটনাও ভূমিকা রেখেছে। অতীতে কিছু মানুষ সাদা চাদর গায়ে দিয়ে ভূত সেজে অন্যদের ভয় দেখাত। ইংল্যান্ডে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে এ ধরনের ছদ্মবেশের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সাদা কাপড়ে শরীর ঢেকে রাখলে অন্ধকারে সহজে চেহারা শনাক্ত করা যেত না। ফলে রাতের বেলায় মানুষকে ভয় দেখানো কিংবা প্রতারণা করার সুযোগ তৈরি হতো। ইংরেজ লেখক রেজিনাল্ড স্কট ১৫৮৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অব উইচক্র্যাফট’ বইয়েও সাদা চাদর পরে মানুষকে প্রতারিত করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ফলে সাদা কাপড়ে ঢাকা ভূতের ধারণা শুধু কল্পকাহিনিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের ছদ্মবেশ ধারণের ঘটনাও এতে প্রভাব ফেলেছিল।

সময়ের সঙ্গে ভূতের সাদা পোশাক গল্পের পাতা ছাড়িয়ে নাট্যমঞ্চেও জায়গা করে নেয়। উনিশ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন নাটক ও মঞ্চনাট্যে ভূতের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে সাদা পোশাক এবং বিশেষ আলোকপ্রক্ষেপণ ব্যবহার করা হতো।

কম আলোতেও সাদা কাপড় দর্শকের চোখে সহজে পড়ত। অভিনেতার শরীর ঢেকে রহস্যময় অবয়ব তৈরি করাও ছিল তুলনামূলক সহজ। পরে ভূতের ছবি ও অতিপ্রাকৃত বিষয় তুলে ধরার বিভিন্ন কৌশলেও সাদা কাপড়ে ঢাকা অবয়ব দেখা যায়। এভাবেই সাদা কাপড়ের ভূত ধীরে ধীরে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়।

অবশ্য সব গল্প, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রে ভূতকে একই রকম দেখানো হয়নি। কোথাও ভূতকে সাধারণ পোশাকে, কোথাও বর্মে, আবার কোথাও মৃত্যুর সময় পরা পোশাকে দেখানো হয়েছে।

একসময় সাদা কাপড়ে ঢাকা ভূতের চেহারা মানুষের মনে ভয় তৈরি করত। তবে বিংশ শতাব্দীতে কার্টুন ও শিশুতোষ বিনোদনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই চেহারার উপস্থাপনাও বদলে যায়।

১৯৩৭ সালে ডিজনির ‘দ্য লোনসাম ঘোস্টস’ কার্টুনে ভূতকে মজার চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়। পরে ‘ক্যাসপার দ্য ফ্রেন্ডলি ঘোস্ট’ চরিত্রটি ভূতকে শিশুদের কাছে বন্ধুসুলভ করে তোলে। ফলে সাদা কাপড়ের ভূত শুধু ভয় দেখানোর প্রতীক থাকেনি; হ্যালোইনের পোশাক, সাজসজ্জা, কার্টুন ও হাস্যরসের অংশ হিসেবেও জনপ্রিয়তা পায়।

ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানোর পেছনে ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যাখ্যা থাকলেও, ভূতের অস্তিত্ব বা তার নির্দিষ্ট রং সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রমাণ নেই। সাদা ভূতের পরিচিত চেহারা মূলত মানুষের কল্পনা, লোককথা, প্রাচীন সমাধি প্রথা এবং বিনোদনমাধ্যমের সম্মিলিত প্রভাবে গড়ে উঠেছে।

অর্থাৎ, ভূতকে সাদা দেখানোর পেছনে কোনো প্রমাণিত অতিপ্রাকৃত নিয়ম নেই। বরং মৃতদেহের কাফন থেকে শুরু করে মধ্যযুগের গল্প, মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ এবং নাটক-সিনেমার উপস্থাপনার মধ্য দিয়েই এই চেহারা জনপ্রিয় হয়েছে।

আজও সাদা চাদর গায়ে দিয়ে ভূত সাজা হ্যালোইনের পরিচিত রীতি। কার্টুন ও গল্পেও এটি বহুল ব্যবহৃত একটি প্রতীক। তাই সাদা কাপড়ের ভূতের রহস্যের উত্তর খুঁজতে হলে অতিপ্রাকৃত জগতের চেয়ে মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকেই তাকাতে হয়।


Share: