ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস শেষ হতে চললেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়েনি। বরং সরবরাহ কম থাকায় আগের তুলনায় ছোট আকারের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এতে একদিকে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জাতীয় মাছটি, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন জেলেরা। লোকসানে জেলেদের দাদন দেওয়া আড়তদার-মহাজনরাও পড়েছেন বিপাকে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালকে ইলিশের প্রধান মৌসুম হিসেবে ধরা হলেও কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার নিম্নমুখী। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছালেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে পাঁচ লাখ টনে নেমে এসেছে।
শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ নয়, কমেছে ইলিশের গড় আকারও। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং প্রজনন পরিবেশ ব্যাহত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশ এক থেকে দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময় প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ শিকার, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালি উত্তোলন, শিল্পকারখানার দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সাগরে মা-মাছ ও জাটকা শিকারেও বড় ইলিশের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও কম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আহরণ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কয়েক দফা হাতবদলের কারণে প্রতিটি পর্যায়ে দাম বাড়ছে। এর সঙ্গে দাদন, অতিরিক্ত মুনাফা, বরফ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে মাছ আহরণের খরচও বেড়েছে। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশও বাজারে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম উঠেছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকায়। এতে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, ভরা মৌসুমেও যদি ইলিশের দাম এত বেশি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের পাতে এ মাছ উঠবে কীভাবে।
ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতাধীন দেশের ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ এবং নয়টি কোনোভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি বছরই সেখানে ইলিশের সরবরাহ সবচেয়ে কম। চলতি জুলাই পর্যন্ত সেখানে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে অভয়াশ্রমগুলো কার্যকরভাবে রক্ষা, জাটকা ও মা-মাছ ধরা বন্ধ, নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ এবং নদীর পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও বিধিমালা, ১৯৮৫-এর যথাযথ প্রয়োগ, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।