বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমে দেওয়া আগের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর নামে উঠে আসা বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে দীপ দাবি করেছিলেন, রাতে একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া শেষে তাঁরা দুজন আলাদা পথে চলে যান। তবে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কয়েকজন লোক ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। একই ঘটনার শেষ মুহূর্ত নিয়ে দুই ধরনের বর্ণনা সামনে আসায় তাহসিফের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে প্রকৃত ঘটনা এখনো তদন্তাধীন।
তাহসিফ সাউরীর (২৮) মরদেহ গত বুধবার বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাঁর পরিচিতজনদের ভাষ্য, সম্প্রতি কয়েকটি হুমকি পাওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তাহসিফ।
পরিবারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোড এলাকার একটি বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। পরিবারের দাবি, দীপই তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।
হেফাজতে নেওয়ার আগে গণমাধ্যমকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাঁর ও তাহসিফের মোটরসাইকেল একই মডেলের। তাহসিফের মোটরসাইকেলটি অকেজো হয়ে পড়ায় তিনি সেটি চালু করতে সহায়তা করেন। পরে দুজন একসঙ্গে উত্তরার একটি ওয়ার্কশপে যান। সেখানে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় কিছু কাজ করা হয় বলে জানান তিনি।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ শেষে তাঁরা আবার অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ফিরে একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। এরপর তিনি নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা হন এবং তাহসিফ অন্য পথে চলে যান। তাহসিফ কোথায় বা কী কাজে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু জানেন না বলেও দাবি করেছিলেন দীপ।
তবে জিজ্ঞাসাবাদের পর পিবিআইয়ের এক পুলিশ সুপার গণমাধ্যমকে জানান, দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন লোক তাঁদের ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। ওই কর্মকর্তা জানান, দীপের বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এদিকে মৃত্যুর আগে নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে কথা বলেছিলেন তাহসিফ। তবে সব তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’
পরিবারের দাবি, যে এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে তিনি কখনো যেতেন না। এ কারণে তিনি কীভাবে সেখানে পৌঁছালেন, তা নিয়েও পরিবারের সদস্যদের মনে প্রশ্ন রয়েছে।
তাহসিফের চাকরি থেকে অব্যাহতি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা ভিডিও-সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পিবিআই জানিয়েছে, দীপের বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির মধ্য দিয়েই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।