Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / ঢাকা বিভাগ / সারাদেশ / ঢাকা / ক্রেতাসংকটে বন্ধ হয়ে গেছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি - Chief TV

ক্রেতাসংকটে বন্ধ হয়ে গেছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি - Chief TV

2026-10-26  ডেস্ক রিপোর্ট  43 views
ক্রেতাসংকটে বন্ধ হয়ে গেছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি - Chief TV

একসময় ছিল ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। দেশি-বিদেশি পোশাক, জুতা, প্রসাধনীসহ নানা পণ্যের দোকানে জমজমাট থাকত পুরো বিপণিবিতান। রাজধানীর শান্তিনগরের অন্যতম পরিচিত কেনাকাটার কেন্দ্র কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি এখন বন্ধ। ক্রেতাসংকট, লোকসান ও বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিলের চাপে শেষ পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দোকানমালিকেরা। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের মূল প্রবেশপথের শাটার নামানো। গত ১ অক্টোবর থেকে বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সেখানে ব্যানার ঝুলছে। দোকান সরিয়ে নেওয়ার বিজ্ঞপ্তিও দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে। একসময়কার ব্যস্ত এই বিপণিবিতানে এখন হাতে গোনা কয়েকটি রেস্তোরাঁ চালু রয়েছে। তবে মার্কেট বন্ধের প্রভাব পড়ছে সেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। ভবনের আবাসিক অংশ অবশ্য বন্ধের সিদ্ধান্তের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

মার্কেটের পার্কিংয়ের সামনে বসে ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নিরাপত্তাপ্রহরী মো. শাহজাহান। প্রায় ২২ বছর ধরে এই বিপণিবিতানে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মার্কেটটির সুদিন ও দুর্দিন—দুই সময়েরই সাক্ষী শাহজাহান। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাঁর চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন নিরাপত্তাকর্মী ও একজন ব্যবস্থাপক রয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের বাইরে আর কোনো কর্মচারী নেই বলে জানা গেছে।

১৯৯৮ সালে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ২০ তলা ভবনটির নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল বিপণিবিতান। চতুর্থ তলায় ছিল খাবারের জায়গা ও বাগান। ওপরের তলাগুলোতে গড়ে তোলা হয় আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট।

যাত্রার শুরুতে দেশি-বিদেশি পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের ১৯৮টি দোকান ছিল এখানে। বেশির ভাগ দোকান ব্যক্তিমালিকানায় বিক্রি করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ক্রেতা কমতে থাকায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। বন্ধ হওয়ার আগে চালু ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫টি দোকান। মার্কেট বন্ধের পর সেগুলোর মালিকেরাও অন্যত্র চলে গেছেন।

মার্কেটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোর অনেক কিছুই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এস্কেলেটর, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও লিফটের সুবিধা না থাকায় ক্রেতাদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ—এমন আলোচনাও ছিল। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য বেশি দামে বিক্রি এবং ভেজাল পণ্য সরবরাহের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তাঁদের ধারণা।

শান্তিনগর উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় দীর্ঘদিনের সংস্কারকাজ, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সৃষ্ট লোকসান এবং বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় বিপণিবিতানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াও ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।

মার্কেট বন্ধের পেছনে আর্থিক সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ক্রেতাসংকটের কারণে দোকানমালিকেরা লোকসানের মুখে পড়ছিলেন। পাশাপাশি সার্ভিস চার্জ আদায় না হওয়া এবং বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় মার্কেট পরিচালনার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি মার্কেটের দোকানমালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল বলেন, মার্কেট পরিচালনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ক্রেতা না আসায় দোকানমালিকেরা লোকসান গুনছিলেন। একপর্যায়ে সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিলসহ প্রয়োজনীয় খরচ পরিশোধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। বকেয়া বাড়তে থাকায় দোকানমালিকেরা সম্মিলিতভাবে মার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।

মার্কেটটির একসময়ের পরিচিত প্রতিষ্ঠান মোহনা জুয়েলার্সও ঠিকানা বদলেছে। বন্ধ ফটকের সামনের পিলার ও দেয়ালে দোকানটির স্থান পরিবর্তনের বিজ্ঞপ্তি দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির নতুন ঠিকানা রাজধানীর নয়াপল্টনের চায়না টাউন শপিং কমপ্লেক্স।

মোহনা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী নির্মল কুমার গুপ্ত জানান, দীর্ঘদিন ধরে মার্কেটে ক্রেতা কম আসছিলেন। শেষ কয়েক বছরে ব্যবসায় তেমন লাভও হয়নি। এ কারণে মার্কেট বন্ধ হওয়ার পর তাঁরা চায়না টাউন শপিং কমপ্লেক্সে চলে গেছেন। সেখানে দোকানের কাজ চলছে এবং শিগগিরই কার্যক্রম শুরু করার আশা করছেন তিনি।

এদিকে মার্কেট বন্ধ থাকলেও নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য মূল ফটকের সামনে অবস্থিত কাচ্চি ভাই, হটকেক, রেমন্ড ও মেজবান ডাইনের মতো কয়েকটি রেস্তোরাঁ চালু রয়েছে। তবে মার্কেটে ক্রেতাদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাতেও প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মচারীরা।

মার্কেটটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে দোকানমালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল জানান, তাঁরা ভবনটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে যাঁরা এটি কিনবেন, তাঁরা সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তা তাঁরাই নির্ধারণ করবেন।

দীর্ঘ ২৮ বছরের উত্থান-পতনের পর কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু একটি বিপণিবিতানের ব্যবসায়িক সংকটের চিত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ব্যবসায়ী ও কর্মীর জীবিকা। একসময়কার জমজমাট মার্কেটটির ভবিষ্যৎ এখন নতুন মালিকানা ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।


Share: