চা-বাগানের সবুজের ভেতর সকাল থেকেই শুরু হয় শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা। কচি চা-পাতা সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। প্রখর রোদ কিংবা মেঘলা আকাশ—কোনো কিছুই তাদের কাজ থামাতে পারে না। তবে বর্ষাকালে হঠাৎ বৃষ্টি নামলেই বাড়ে দুর্ভোগ। অনেক সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ না থাকায় ভিজতে ভিজতেই চা-পাতা সংগ্রহ করতে হয় শ্রমিকদের।
এবার সেই চিত্র কিছুটা বদলানোর আশায় বুক বাঁধছেন মৌলভীবাজারের চা শ্রমিকরা। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা-বাগানের শ্রমিকদের হাতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া রেইনকোট পৌঁছানোর পর তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আনন্দ ও স্বস্তি। শ্রমিকদের কাছে এটি শুধু বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার উপকরণ নয়, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের প্রতি রাষ্ট্রের নজর দেওয়ার প্রতীকও।
শ্রমিকরা বলছেন, রেইনকোট পরে বৃষ্টির মধ্যেও কাজ করা সহজ হবে। কাপড় ভিজে যাওয়া, ঠাণ্ডা লাগাসহ বর্ষাকালের নানা ভোগান্তি কিছুটা কমবে। বিশেষ করে টানা বৃষ্টির মধ্যে চা-পাতা সংগ্রহের সময় তারা আগের তুলনায় স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ১০ জন চা শ্রমিকের হাতে রেইনকোট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগের আওতায় সারা দেশের মোট ২০ হাজার চা শ্রমিকের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ করা হবে।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন চা-বাগানে ৪০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন। খোলা মাঠে চা-পাতা সংগ্রহের সময় বৃষ্টি শুরু হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী শ্রমিকরা। মাথায় চা-পাতার ঝুড়ি ও হাতে কাঁচি নিয়ে বৃষ্টির পানি সামলে কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাদের।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনযাপন, সমস্যা ও প্রয়োজন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অবগত রয়েছেন। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের সমস্যা ও তাদের চাহিদার বিষয়েও তিনি জানেন। রেইনকোট দেওয়ার উদ্যোগ তারই প্রতিফলন।
তিনি জানান, মঙ্গলবার তার নির্বাচনী এলাকা থেকে ১০ জন চা শ্রমিককে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথা বলেন, সমস্যার কথা শোনেন এবং রেইনকোট উপহার দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, সরকার এবং রেইনকোট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা পরেশ কালিন্দি বলেন, সংসদ সদস্যের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীও চা শ্রমিকদের প্রতি আন্তরিক। দীর্ঘদিন পর তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা মন খুলে বলার মতো একজন মানুষ তারা পেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রীমঙ্গল রাজঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কানাই গোয়ালা বলেন, নির্বাচনের আগে মৌলভীবাজারে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিকদের কথা বলেছেন। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর শ্রীমঙ্গলে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এবার বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে থাকা শ্রমিকদের জন্য রেইনকোট উপহার দিয়েছেন। এতে চা শ্রমিকদের প্রতি তার আন্তরিকতার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে রেইনকোট পাওয়া ১০ শ্রমিকের মধ্যে রয়েছেন শ্রীমঙ্গলের কালিঘাট চা-বাগানের শান্তি উড়িয়া, মাকড়িছড়া চা-বাগানের মুন্নী কুর্মি, ভাড়াউড়া চা-বাগানের জ্যোৎস্না আক্তার, রাজঘাট চা-বাগানের রিনা তাঁতী ও শশিকা ব্যানার্জি এবং মাজদিহি চা-বাগানের সন্তুকী রায়। কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগানের কবিতা কর্মকার, মাধবপুর চা-বাগানের সুজাতা বিশ্বাস, উত্তর আলীনগর চা-বাগানের রিতা রাণী বাউরী এবং পাত্রখোলা চা-বাগানের আফখাতুন নাহারও এ তালিকায় রয়েছেন।
সবুজ চা-বাগান, মাথার ওপর মেঘ আর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেই এবার নতুন এক চিত্র দেখা যেতে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে নয়, রেইনকোট গায়ে দিয়েই চা-পাতা সংগ্রহ করবেন শ্রমিকরা। তাদের কাছে এই ছোট্ট পরিবর্তনই হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের মাঝে বড় এক স্বস্তির কারণ।