দুই হাত অকেজো। হাত দিয়ে কোনো কিছু ধরতে পারেন না, নেই শক্তিও। কিন্তু শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতা থামিয়ে রাখতে পারেনি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের শারমিন আলম নিপুকে। পা দিয়ে লিখেই স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষ করে নোয়াখালী সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে ২০২২ সালে মাস্টার্স পাস করেছেন তিনি। এখন তার একমাত্র স্বপ্ন একটি সরকারি চাকরি।
শারমিন ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী কোটায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে ফলাফল তার পক্ষে আসেনি। চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হতে আর মাত্র চার মাস বাকি থাকায় এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরকারি চাকরির সুযোগ চেয়েছেন তিনি।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রাজগঞ্জ ইউনিয়নের দরিদ্র কৃষক ফিরোজ আলমের মেয়ে শারমিন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি এবং মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করার পর নোয়াখালী সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে শারমিন সবার বড়।
শারমিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই পা দিয়ে লেখার চর্চা করেছেন। হাতে লিখতে বা টাইপ করতে অন্যদের যে কাজ করতে হয়, তিনি পা দিয়েই তা করতে পারেন। এভাবেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এখন তার প্রয়োজন শুধু একটি চাকরি।
তিনি বলেন, নোয়াখালী থেকে ঢাকায় গিয়ে অনেক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। পরীক্ষার পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় করার পাশাপাশি শারীরিক কষ্টও সহ্য করেছেন। কোনো কোনো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরবর্তী ধাপে আর ডাকা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শারমিন জানান, ২০২৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাকে চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি মৌখিক পরীক্ষার জন্যও ডাকা হয়নি।
তার ভাষায়, তিনি অশিক্ষিত বা অযোগ্য নন; তিনি কাজ করতে চান এবং নিজের যোগ্যতা দিয়ে জীবন গড়তে চান। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হওয়ার আগে একটি সুযোগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে কোথাও চাকরি না পেয়ে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছেন শারমিন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে পরিবারটিও আর্থিক সংকটে রয়েছে। মেয়ের একটি চাকরি হলে সংসারের অনটন অনেকটাই কমে আসবে বলে জানান তার বাবা কৃষক ফিরোজ আলম।
ফিরোজ আলম বলেন, তিনি দরিদ্র কৃষক হওয়া সত্ত্বেও অভাবের মধ্যে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। এখন তার মেয়ে উচ্চশিক্ষিত এবং নিজের যোগ্যতায় কাজ করতে সক্ষম। তাই তারা কোনো সহায়তা বা ভিক্ষা চান না; মেয়ের জন্য একটি সরকারি চাকরির সুযোগ চান।
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই শারমিন পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ও মেধাবী ছিলেন। পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করা তার অদম্য মনোবলের প্রমাণ। তবে পরিবারের আর্থিক সংকটও প্রকট। পরিবারের ওপর প্রায় সাত লাখ টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
এর আগে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে শারমিনকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সামনে ফুটপাতে বসে পা দিয়ে লেখার সক্ষমতা দেখিয়েছিলেন তিনি। পরে পরীক্ষার হলে বেঞ্চের ওপর দুই পা তুলে ডান পা দিয়ে লিখে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন শারমিন।
শারমিনের জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখিয়ে দিয়েছে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এখন তার প্রত্যাশা, যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিবেচনা করে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে এবং একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে।