Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রাজশাহী বিভাগ / সারাদেশ / সিরাজগঞ্জ / শীতের আগমনী বার্তা, খেজুর গাছ প্রস্তুত করছেন গাছিরা - Chief TV

শীতের আগমনী বার্তা, খেজুর গাছ প্রস্তুত করছেন গাছিরা - Chief TV

2026-10-26  আরিফুল ইসলাম, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ  54 views
শীতের আগমনী বার্তা, খেজুর গাছ প্রস্তুত করছেন গাছিরা - Chief TV

শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি। দিনে গরমের তীব্রতা থাকলেও রাতের শেষ ভাগে অনুভূত হচ্ছে শীতের আমেজ। ভোরে ঘাস, লতাপাতা ও আমন ধানের ডগায় জমছে শিশিরবিন্দু। প্রকৃতির এমন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন গাছিরা। শীত মৌসুমে রস সংগ্রহের লক্ষ্যে খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার ও গাছের মাথা প্রস্তুত করছেন তাঁরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জমির আইল, সড়কের পাশ ও পুকুরপাড়ে থাকা খেজুরগাছগুলো প্রস্তুত করছেন গাছিরা। ডালপালা ছেঁটে গাছ পরিষ্কার করার পাশাপাশি রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন গাছের মাথা। স্থানীয় ভাষায় গাছ প্রস্তুতের এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কাম দেওয়া’। প্রস্তুতি শেষ হলেই শুরু হবে রস সংগ্রহের পালা।

স্থানীয় গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুরের রস সংগ্রহ করতে প্রথমে গাছের মাথা পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট অংশ কেটে প্রস্তুত করতে হয়। এরপর সেখানে নল লাগিয়ে নিচে মাটির হাঁড়ি বেঁধে রাখা হয়। রাতভর হাঁড়িতে জমা হওয়া রস ভোরে সংগ্রহ করেন গাছিরা। পরে সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড়।

তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের রানীদিঘী গ্রামের গাছি ইয়াছিন বলেন, সাধারণত কার্তিক মাসে রস সংগ্রহের জন্য খেজুরগাছ প্রস্তুত করা হয়। তবে শীতের আগমনের কারণে এবার একটু আগেই গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন তিনি। একটি গাছের ডালপালা ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করতে প্রায় এক দিন সময় লাগে।

তিনি জানান, রস সংগ্রহে সাধারণত ৬ থেকে ১০ লিটার ধারণক্ষমতার মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। হাঁড়ির ভেতরে চুনের প্রলেপ দিলে রস সংরক্ষণে সুবিধা হয়। তবে কাঁচা খাওয়ার জন্য যে রস সংগ্রহ করা হয়, সেই হাঁড়িতে চুন দেওয়া হয় না।

ইয়াছিনের ভাষ্য, একটি খেজুরগাছ থেকে প্রায় দুই থেকে তিন মাস রস পাওয়া যায়। গাছের আকার ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন একটি গাছ থেকে এক থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব। সাধারণত তিন দিন রস সংগ্রহের পর পরবর্তী তিন দিন বিরতি দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পালি দেওয়া’।

নিজের কর্মব্যস্ততার বর্ণনা দিয়ে ইয়াছিন বলেন, বিকেল ৩টা থেকে গাছে গাছে হাঁড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেন তিনি। পরদিন ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে কুয়াশাঘেরা পরিবেশে রস সংগ্রহ করেন। সব গাছ থেকে রস নামিয়ে বড় পাত্রে বাড়িতে নিয়ে আসার পর তা ছেঁকে জ্বাল দেওয়া হয়। আগুনের তাপে রস ঘন হয়ে ধীরে ধীরে লালচে রং ধারণ করে। তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে খেজুরের গুড়ের মিষ্টি সুগন্ধ।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে এই গাছি বলেন, বয়স বাড়ায় আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। একসময় ১০০ থেকে ১২০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করলেও এখন করেন ৫০ থেকে ৬০টি গাছ থেকে। এসব রস দিয়ে দানা ও লালি গুড় তৈরি করেন তিনি। তাঁর হিসাবে, এক কেজি গুড় তৈরি করতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রয়োজন হয়।

নিজের কোনো খেজুরগাছ না থাকায় অন্যের গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে হয় ইয়াছিনকে। বিনিময়ে গাছের মালিককে প্রতি গাছের জন্য দুই থেকে তিন কেজি গুড় দিতে হয়। ছোটবেলা থেকেই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখনো কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে এ পেশা টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে তাঁর।

অন্যদিকে খেজুরের রস সংগ্রহকারী মোতালেব, শরিফুল, আজমল ও জাহিদুল জানান, আগের তুলনায় এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যা কমে গেছে। এবার তাঁরা প্রত্যেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে দু-একজনের নিজস্ব গাছ থাকলেও অধিকাংশকেই অন্যের গাছ চুক্তিতে নিতে হয়। প্রতিটি গাছের জন্য মালিককে সাত কেজি লালি গুড় অথবা এক হাজার টাকা দিতে হয়। গাছ প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় এখন রস সংগ্রহ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। রস ও গুড় বিক্রি করে কৃষকেরা বাড়তি আয় করতে পারেন। খেজুরগাছের জন্য আলাদা করে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। তাই বাড়ির আশপাশে, জমির আইলে, পুকুরপাড়ে ও সড়কের পাশে খেজুরগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে খেজুরবাগান গড়ে তুলতে পারলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াশের গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। গাছিরা এখন ব্যস্ত গাছ প্রস্তুত ও হাঁড়ি বাঁধার কাজে। তাঁদের প্রত্যাশা, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছে গাছে হাঁড়ি ঝুলবে, আর ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হবে খেজুরের রস সংগ্রহের চিরচেনা কর্মযজ্ঞ।


Share: