চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নির্জন মাঠে মাটির নিচে সুড়ঙ্গসদৃশ একটি কক্ষে ২৬ বছর ধরে সাধনা করছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামে এক নারী। ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামে আশ্রম গড়ে সেখানে ধ্যানের পাশাপাশি এতিম ও পথশিশুদের লালন-পালন এবং মানবসেবায় জীবন কাটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ী গ্রামের জনবসতিহীন ‘বেইলের মাঠে’ সাড়ে সাত শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে আশ্রমটি। টিনের চালার নিচে সিঁড়ি দিয়ে নামলেই দেখা মেলে অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো একটি কক্ষের। ২০০০ সালে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাভলী শাহ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রাজবাড়ীর মাহবুব আলম বাচ্চু ও রংপুরের আলভী বেগম নামে দুই খাদেম।
মাহবুব আলম বাচ্চুর ভাষ্য, তিনি ও লাভলী শাহ দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সেখানে সাধনা করছেন। আশ্রমে নিয়মিত সাধুসঙ্গ ও ফলসেবার আয়োজন করা হয়। লাভলী শাহর নিজের গর্ভে সন্তান না থাকলেও জীবনে কুড়িয়ে পাওয়া ২০ জনের বেশি এতিম ও পথশিশুকে লালন-পালন করে বড় করেছেন বলে জানান তিনি। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগলেও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন লাভলী শাহ।
নিজের অতীত সম্পর্কে লাভলী শাহ জানান, শৈশবে তিনি ইরাকে ছিলেন। পরে পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। পাঁচ বছর বয়সে ইরাকে থাকার স্মৃতি তাঁর মনে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ বছর বয়সে এক সাধু তাঁর নাম রাখেন লাভলী এবং তাঁর কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক দীক্ষা নেন। পরে লালন শাহের দর্শনে অনুপ্রাণিত হন। তবে নিজের বয়স, বাবা-মা ও জন্মপরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
লাভলী শাহ জানান, ১৯৭৯ সাল থেকেই নির্দিষ্ট এই স্থানের সন্ধান করছিলেন তিনি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০০০ সালে ঘোলদাড়ীর নির্জন মাঠে এসে বসবাস শুরু করেন। দিনের বেলায় শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, আর রাতে মাটির নিচের কক্ষে সাধনা করতেন।
আশ্রমে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি রয়েছে। লাভলী শাহর মতে, মানবধর্মই বড় ধর্ম। জাতপাত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভেদাভেদ নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই আশ্রমের মূল শিক্ষা।
তবে নির্জন আশ্রমে তাঁর জীবন সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। লাভলী শাহ জানান, অতীতে একাধিকবার ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের কবলে পড়েছেন তিনি। একপর্যায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া লালন শাহকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করা একটি মূল্যবান ডায়েরিও হারিয়ে গেছে।
লাভলী শাহর দাবি, তিনি সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদান পাননি। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চান তিনি। মৃত্যুর পর আশ্রমেই তাঁকে রেখে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন এই সাধক।