সুন্দরবনে বন বিভাগের কঠোর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়মিত অভিযানের ফলে হরিণ শিকার এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো বন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে বনরক্ষীদের নিয়মিত ফুট পেট্রোলিং, স্মার্ট পেট্রোলিং, বোট পেট্রোলিং, দিন-রাত ঝটিকা অভিযান ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারিতে চোরা শিকারি ও বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্রের তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাসের জুন, জুলাই ও ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে ৩ হাজার ২১৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে চারটি মামলা দায়েরের পাশাপাশি ১৩টি নৌকা, ছয়টি মাছ ধরার জাল, ৩২ বোতল, দুই লিটার তরল ও তিন প্যাকেট বিষ, ১৫১ দশমিক ৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি এবং দুই বস্তা শুঁটকি চিংড়ি ও পাঁচ কেজি শুঁটকি মাছ উদ্ধার করা হয়েছে।
গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছর বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনায়ও কমতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আটটি মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় ২৭টি নৌকা, ২১টি জাল, ৫২ বোতল ও পাঁচ লিটার বিষ, ২৪৫ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ১৪৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি, ১৭৭ কেজি সাদা মাছ ও ২২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি উদ্ধার করা হয়।
হরিণ শিকার রোধেও চলতি বছর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসে হরিণ শিকারের অভিযোগে নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ছয়টি মামলা করা হয়েছে। এ সময়ে কোনো হরিণের মাংস, চামড়া বা মৃত হরিণ উদ্ধার হয়নি। তবে শিকারিদের পাতা ১৪ হাজার ৩৮১ ফুট মালা ফাঁদ, ১১০টি ছিটকা ফাঁদ, ৪৬ ফুট হাটা ফাঁদ ও ৬৯টি ডোয়া ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি নৌকা ও তিনটি ট্রলার আটক করা হয়।
অন্যদিকে, গত বছরের একই সময়ে ২০টি মামলায় ১২ জন হরিণ শিকারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন ১৫৬ দশমিক ৫ কেজি হরিণের মাংস, পাঁচটি মাথা, আটটি পা, দুটি চামড়া ও দুটি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ৩৩ হাজার ৭০৩ ফুট মালা ফাঁদ, ২৫৮টি ছিটকা ফাঁদ, ১ হাজার ৫০৫ ফুট হাটা ফাঁদ, ২৫ ফুট গলা ফাঁদ এবং নয়টি নৌকা ও ছয়টি ট্রলার জব্দ করা হয়েছিল।
সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান নাসিম আলী বলেন, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারির ফলে বন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার দাবি, পূর্ব সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে এখন হরিণের মাংস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বনরক্ষীদের শূন্য পদ পূরণ, দ্রুতগতির নৌযান বাড়ানো, আরও ড্রোন ব্যবহার এবং জেলে ও বনজীবীদের নৌযানে জিপিএস ট্র্যাকিং চালুর দাবি জানান।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ আগের চেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভরভাবে কাজ করছে। দুর্গম বনাঞ্চলে নিয়মিত পেট্রোলিং, ঝটিকা অভিযান ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর ফলে হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী চক্রের তৎপরতা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। অপরাধের নিম্নমুখী ধারা ধরে রাখতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আরও কঠোর অভিযান ও আধুনিক নজরদারি চালানো হবে বলেও জানান তিনি।