চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মো. মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বুধবার ফটিকছড়ি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার অপরাধজগতে প্রবেশ থেকে শুরু করে খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকায় নিজের নাম কোনো রকমে লিখতে পারলেও পড়তে পারেন না বলে পুলিশ জানিয়েছে। কর্মজীবনের শুরুতে রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামে এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে মোবারকের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিতি পান।
পুলিশ আরও জানায়, শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন মোবারক। নাছির কারাগারে যাওয়ার পর উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈয়বের সঙ্গে মোবারকের একাধিক ছবিও রয়েছে।
এরপর বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা, চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি এবং দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার কিছু দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরাতেও ধরা পড়ে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানোর পর মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করতেন। কিছুদিন পর আবার ফিরে এসে খুন, চাঁদাবাজি ও গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়তেন। দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর শেষ পর্যন্ত ফটিকছড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় মোবারকের সঙ্গে আরও তিন সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি এবং চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে মোবারক ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন বলেও পুলিশের দাবি। পরে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়।
পুলিশের দাবি, মোবারক যে পিস্তল দিয়ে গুলি করেছিলেন সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি এসএমজির মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়েও চলাফেরা করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সঙ্গে যুক্ত হন মোবারক। ইমন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, মোবারক বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন। সাজ্জাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতেন মোবারক। তার দাবি, সাজ্জাদ বাহিনীতে সাহসী ও অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হিসেবে মোবারকের পরিচিতি ছিল এবং তিনি দুই হাতে অস্ত্র চালাতে পারতেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক ইমনের কাছে অস্ত্র চালানো শিখেছেন বলে জানিয়েছেন বলে পুলিশ জানায়। দুই হাতে অস্ত্র চালানো তার শখ ছিল বলেও দাবি করেছে পুলিশ। গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্যমতে, ওই দিন বেলা দেড়টার দিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাসুদুল দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন এবং কয়েকজন অস্ত্রধারী তাকে অনুসরণ করছেন। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তিনি পড়ে গেলে অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন।
পুলিশ আরও জানায়, প্রথম দফায় গুলি করে চলে যাওয়ার পর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ড পর আবার ঘটনাস্থলে ফিরে আসেন মোবারক। এরপর আবারও গুলি করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তিনি। প্রকাশ্য বাজারে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটলেও আতঙ্কে কেউ এগিয়ে আসেননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।