স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই হাত হারিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রথমে মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেন। পরে পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলে মাধ্যমিকে অর্জন করেন জিপিএ-৫। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছেন চট্টগ্রামের এই শিক্ষার্থী।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। রফিকুল চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
এলাকায় রাব্বি নামে পরিচিত রফিকুল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা বজলুর রহমান একসময় জাহাজভাঙা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মা রোজি আক্তার দিনমজুর। তিন ভাই-বোনের মধ্যে রফিকুল সবার বড়।
২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর তাঁর জীবনে নেমে আসে বড় দুর্ঘটনা। তখন তিনি ভাটিয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি পদচারী-সেতু পার হওয়ার সময় সেতুর পাশে থাকা বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে স্পৃষ্ট হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তাঁর দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।
তবে দুর্ঘটনার পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। প্রথম দিকে মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেন। ওই পরীক্ষায় জিপিএ-৪ দশমিক ৮৩ পান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর পা দিয়ে লেখার অভ্যাস করেন। পরে উপজেলার হাজী টিএসি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে এ প্লাস পেয়েছেন রফিকুল। অন্য বিষয়গুলোতে পেয়েছেন এ গ্রেড।
বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে ভাটিয়ারীর দুই কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। রফিকুল জানান, তাঁর কলেজের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। প্রতিদিন যাতায়াতে প্রায় ১০০ টাকা খরচ হতো, যা পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন ছিল। তিনি বলেন, কলেজে যাতায়াতেই অনেক সময় চলে যেত। তাই নিয়মিত ক্লাস করতে পারেননি। অনলাইনে ক্লাস করে এবং ইউটিউবের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান রফিকুল। আপাতত তাঁর লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এ জন্য অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করছেন এবং ভর্তি প্রস্তুতিমূলক ভিডিও দেখছেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের মতো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
রফিকুলের বাবা বজলুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর দুই বছরের বেশি সময় ছেলেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ছেলেকে বাঁচাতে বাড়িঘরসহ তাঁদের সব সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে। পরে শ্বশুরবাড়িতে একটি ঘরে থেকে দিনমজুরের কাজ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, রফিকুল অত্যন্ত মেধাবী এবং পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ প্রবল। মানুষের সহযোগিতা নিয়ে ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
বজলুর রহমান জানান, রফিকুলের পড়াশোনাসহ যাবতীয় খরচ বহন করছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী। এসএসসি পরীক্ষার পর প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দেখে তিনি সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। এ ছাড়া শিক্ষক মো. ওসমান বিনা মূল্যে রফিকুলকে কোচিং করিয়েছেন।
রফিকুলের বোন রোকাইয়া আক্তারও ভাটিয়ারী বিজয় স্মরণি কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বজলুর রহমান বলেন, দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো তাঁদের জন্য কঠিন ছিল। এখন তাঁর প্রত্যাশা, ছেলে উচ্চশিক্ষা শেষ করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে।