নিউজিল্যান্ডে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে কক্সবাজার থেকে সমুদ্রযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া এক পরিবারের সেই স্বপ্ন থেমে গেছে বঙ্গোপসাগরের তীরে। কাঠের ক্যাটামারান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ভেঙে দুর্ঘটনার পর পরিবারের এক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে থাকা নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পাডনি এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
পরিবারটির পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশের নদীপথ পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে সেখান থেকে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করা। কিন্তু সমুদ্রে যাওয়ার পথে নৌকাটি ভেঙে পড়লে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
জানা যায়, ৭৪ বছর বয়সী জন এডওয়ার্ড পাডনি, তার স্ত্রী বেলা, ১৩ বছরের ছেলে রালফ এবং ১৬ বছরের ছেলে আলবার্ট ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের ৫৮ ফুট দীর্ঘ কাঠের ক্যাটামারানে অবস্থান করছিলেন। বাঁকখালীর মোহনা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোনোর সময় নৌকার দুই অংশের সংযোগস্থলে সমস্যা দেখা দেয়। পরে প্রবল ঢেউয়ের চাপে নৌকাটি দুই ভাগ হয়ে যায় এবং চারজনই পানিতে পড়ে যান।
জন সাঁতার জানতেন না। ভাঙা নৌকার একটি অংশ ধরে তিনি ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। ছেলে রালফ সাঁতরে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে বেলা ধ্বংসাবশেষ থেকে বের হয়ে লাইফবোটে উঠতে সক্ষম হলেও আলবার্টকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কয়েক দিন পর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাছাকাছি সৈকতে তার মরদেহ ভেসে ওঠে।
‘আইল্যান্ড গার্ল’ শুধু একটি নৌকা ছিল না; প্রায় ছয় মাস ধরে এটিই ছিল পরিবারটির বসবাসের জায়গা। দুই খোলবিশিষ্ট ক্যাটামারানটির মাঝখানে প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, ছয়টি কক্ষ ও দুটি ১২০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন ছিল। স্থানীয় কারিগরদের সহায়তায় কক্সবাজারের এসএম পাড়ার একটি নৌকা তৈরির কারখানায় নৌকাটি নির্মাণ করা হয়।
জন বহু বছর ধরে কাঠের বাড়ি ও নৌকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিউজিল্যান্ডে ফেরার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে বসেই নৌকাটি তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি। মূলত গর্জন কাঠ ব্যবহার করে নৌকাটি নির্মাণে দেড় বছরের বেশি সময় লাগে। এতে ব্যয় হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
২০২৫ সালের জুনে কক্সবাজার শহরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেও পরে পরিবারটি ধীরে ধীরে নৌকাতেই বসবাস শুরু করে। বাঁকখালী নদীতে বিআইডব্লিউটিএ ঘাটের কাছে নোঙর করে চলছিল তাদের জীবনযাপন।
এর আগে পরিবারটি নৌকায় চট্টগ্রামেও গিয়েছিল। ফেরার পথে সোনাদিয়া দ্বীপে অবস্থানকালে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল তাদের ওপর একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায় বলে জানা যায়। পরে কোস্ট গার্ড তাদের উদ্ধার করে এবং লুট হওয়া জিনিসপত্রের একটি বড় অংশ উদ্ধার করা হয়।
জনের পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম থেকে থাইল্যান্ডের দিকে যাত্রা করার। তবে ডিজেল সংকটের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে ডিজেল সংগ্রহ এবং অন্যান্য জটিলতা মেটাতে তারা কক্সবাজারের দিকে ফিরছিলেন। সর্বশেষ পরিকল্পনা ছিল অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে নিউজিল্যান্ডে যাওয়া।
দুর্ঘটনার পর নৌকাটি সমুদ্রযাত্রার উপযোগী ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাঠের গুঁড়ি দিয়ে দুই অংশ জোড়া দেওয়া নৌকাটি গভীর সমুদ্রের বড় ঢেউ সামলাতে সক্ষম ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে জন নৌকার নকশায় ত্রুটি থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, নৌকা তৈরিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। নৌকাটি নিউজিল্যান্ডের উত্তাল সমুদ্রের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। তবে নির্মাণের পর তিনি বুঝতে পারেন, কিছু কাঠ প্রত্যাশিত মানের ছিল না। নৌকায় পরবর্তীতে তেলাপোকার উপদ্রবও দেখা দিয়েছিল বলে জানান তিনি।
নৌকাটি কী কারণে ভেঙে পড়েছে, তা নিশ্চিত হতে আরও তদন্ত ও কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে পরিবারটির বাংলাদেশে অবস্থান নিয়েও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পোর্ট এন্ট্রি ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তারা। পরবর্তীতে একাধিকবার ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তারা দেশে অবস্থান করেন। সর্বশেষ ভিসার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২৪ মে।
দুর্ঘটনার পর কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাবারের ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং পুলিশি নিরাপত্তাও দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহীদুল আলম।
দুর্ঘটনায় পরিবারটির অর্থ, ব্যাংকসংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। ‘আইল্যান্ড গার্ল’-এর ভাঙা দুটি অংশ এখনো সৈকতে পড়ে আছে। সেগুলো বিক্রি করে জরুরি খরচের অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন জন।
শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসকেও নিজেদের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন তিনি। আপাতত বাংলাদেশেই থাকতে চান জন। অন্তত ছেলে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
নিউজিল্যান্ডে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে যে নৌকা একদিন বাঁকখালীর তীর ছেড়েছিল, সেই ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন কক্সবাজারের সৈকতে পড়ে থাকা দুটি ভাঙা কাঠের অংশ। আর তার সঙ্গে থেমে গেছে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন।