সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কেওড়া উপকূল রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। নদী-খাল ও লবণাক্ত চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই উদ্ভিদের ফল এখন উপকূলের মানুষের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। বর্ষা মৌসুমে গাছে প্রচুর ফল ধরে। স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এই ফল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার, আচার ও চাটনি তৈরি করা হয়। ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সঙ্গে কেওড়া ফলের রান্নাও উপকূলীয় এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।
কেওড়া ফলকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। মৌসুমে নারীরা কেওড়া সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আচার ও চাটনি তৈরি করছেন। স্থানীয়ভাবে এর চাহিদা থাকলেও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিংয়ের অভাবে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছাতে পারছেন না ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেওড়া ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্য দেশব্যাপী বাজারজাত করা গেলে উপকূলীয় নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের গবেষণায় কেওড়া ফলে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
শুধু মানুষের খাদ্য নয়, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর খাদ্যচক্রেও কেওড়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চিত্রা হরিণ, বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি কেওড়া ফল খায়। বসন্তকালে কেওড়া ফুলে মৌমাছির বিচরণ বাড়ে, যা সুন্দরবনের মধু উৎপাদনেও ভূমিকা রাখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায় প্রচলিত কৃষি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে কেওড়া একটি সম্ভাবনাময় উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমানো, নদীভাঙন রোধ ও চরভূমি স্থিতিশীল রাখতেও কেওড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পরিকল্পিতভাবে কেওড়া সংরক্ষণ ও বনায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। অবৈধভাবে কেওড়া গাছ কাটা বন্ধে নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক বনায়নেও এই উদ্ভিদকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কেওড়া ফলের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন উপকূলের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে, অন্যদিকে তেমনি সংরক্ষিত থাকতে পারে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তুতন্ত্র।